সীতার বিলাপ
সীতার বিলাপ
মহাকাব্যে বনপর্বে ঋষি মার্কেন্ডয়।
শ্রীরামের লীলাপ্রীতি অতি সুধাময়।
ত্রেতাযুগে যুধিষ্ঠিরে করিল বর্ণন।
ধর্ম ভয়হীন এক, পাপিষ্ঠ রাবণ।
দশানন জানকীরে করিল হরণ।
মহাভারতের কথা কহিব এখন।
তাহাতে বিশ্বাস যদি করো হে রাজন।
সুস্থ শিষ্ঠ ভাবে কই, ওহে প্রাণধন।
সাধুবেশে ভিক্ষা মেগে, হৃদয় রঞ্জন।
সীতাকে হরণ ক'রে, দুষ্ট দশানন।
লঙ্কার অশোক বনে রাখিল তাহাকে।
রাক্ষসীরা খাবে তাই, কহিল সীতাকে।
ভয়ঙ্কর রাক্ষসীর কড়া পাহারায়।
শ্রীরামে বিচ্ছিন্ন হয়ে, আমি মৃতপ্রায়।
মেরে ফেলো খেয়ে ফেলো কহিল জননী।
নির্বাসিত পতি মোর, তবু ছিনু রানি।
কি ছার আমার এই অসার জীবন।
প্রাণত্যাগ করি যদি, কি হবে এখন।
পিতৃ ঘরে ছিনু আমি পিতার দুলালী।
স্বামী ঘরে রাজরানী, স্বামী মহাবলি।
রাহুগ্রস্ত পরিবার, হলো দেশান্তরী।
নির্বাসিত মোর স্বামী, হয় বনচারী।
প্রজ্বলিত দুখানল দুই চক্ষে ঝরে।
হাসি মুখে স্বামী সঙ্গ, ধরি তার করে।
শশধরে যথা রাহু, করেছেন গ্রাস।
গ্রহণ লাগিল মোর, এমনি প্রকাশ।
সাধু বেশে দুরাচারী, হরণ করিল।
দৈত্য দানবের মাঝে আমারে ফেলিল।
কি জানি কি ভেবে মোরে রাখিল এখানে।
প্রৌঢ় অপরাধ করে, ক্ষমি কি কারণে।
নানা ছদ্মবেশ ধরে, মোরে আশা করে।
মায়ায় ছলনা করে, স্বামী বেশ ধরে।
ক্ষণে ক্ষণে বিনামেঘে হয় বজ্রপাত।
জাগরণে দেখি স্বপ্ন তার কালো হাত।
জীবন যৌবন যাবে, আর পরিবার।
এ বয়সে সব আশা করি পরিহার।
দিন দেখে লগ্ন দেখে, বিবাহ আমার।
তবু কেন সুখ নাই, করতো বিচার।
ইতিহাস কিবা কবে, কি তার আধার।
কোন পাপে এ কপাল হলো ছারখার।
করেছি কি অপরাধ আজ ছিন্ন বেশ।
সৎকর্মে কি দোষ ছিল ছাড়িলাম দেশ।
অন্তরেতে শোকদীপ দাব দগ্ধ প্রায়।
কেমনে খুঁজিবে মোরে কার এত দায়।
পূর্ণ নিরাশায় আজ সিক্ত অশ্রুজলে।
কি করি কি বলি বিষম বিপদকালে।
নারীর ভীষণ লোভ, পেতে অলঙ্কার।
সোনার হরিণ দেখে, মনেতে বিকার।
রাজ অলঙ্কার ছেড়ে হই বনবাসী।
তবে কেন লোভ করি, স্বর্ণ ছদ্মবেশী।
ভাইসম লক্ষণের করি অপমান।
তাঁর টানা অগ্নিরেখা, করিনি সম্মান।
কত অপবাদে করি তাহার বিচার।
হায়রে জনক পিতা, তনয়া তোমার।
শোনো শোনো রাবণের রাক্ষসী প্রহরী।
এত দোষে দোষী আমি, প্রাণ নাও হরি।
আমার দোষেতে এবে, বয়স্ক জটায়ু।
পাখনা আহত পেয়ে, ক্ষীণ হলো আয়ু।
কি জানি কি হলো তাঁর পড়েছিল বনে।
শুনেছিনু স্বামী তাঁর, হৃদয় আসনে।
কথা শুনে রাক্ষসীরা, হাসাহাসি করে।
ভক্ষণ করিলে শেষে, মৃত্যু হবে তোর।
সব ব্যথা মিটে যাবে, কাল হলে ভোর।
তাহাদের মধ্যে ছিল ত্রিজটা রাক্ষসী।
ধর্ম প্রাণ সত্যবাদী, কহিলেন আসি।
কেন করো মিথ্যে তাপ, জনক নন্দিনী।
হাজার চেষ্টাতে দুষ্ট না ধরিবে পানি।
অভিশপ্ত রাবনের, এই হলো নীতি।
লঙ্কায় বহু নারীর করেছে সে ক্ষতি।
তারপর একদিন, স্বর্গ রাজ্য জয়ে।
স্বর্গে নলকুবেরের স্ত্রী রম্ভাকে পেয়ে।
করেছিলো স্পর্শ তারে, মোহিত রাবণ।
সেই অপরাধে তার, অসার জীবন।
কুবের ক্রোধিত হয়ে দিলো অভিশাপ।
যতই ত্রিভুবনে তার থাকুক প্রতাপ।
অনুমতি ছাড়া যদি স্পর্শ করে নারী।
সেখানেই ভস্ম হবে, ঘোর অত্যাচারী।
তারপর দিনে দিনে, কেটেছে বছর।
দেখো দেখি বিচারিয়ে মনের ভিতর।
কোন নারীর অমতে স্পর্শ করে নাই।
রাবণের মৃত্যু ভয়, কোথা শুনি ভাই।
কূটনীতি বিজড়িত, বোন সুর্পনখা।
পদ্মদিঘি জলে যেন, জ্বলে অগ্নিশিখা।
কপটে কৌশলে শোধে বৈরিতার ধার।
প্রকাশ্যে সে করে দেয় বিষাদ প্রহার।
জানিবে রমণী রোষ তুষানল প্রায়।
প্রকাশ্যে পীড়িবে নারী, শুধিবে ছুতায়।
মনে মনে অভিশাপ, মর্মের ব্যথায়।
জ্বলে সদা মনরোষে, আপন শিক্ষায়।
প্রতিহিংসা পরায়ণ, লঙ্কেস রাবণ।
ভগিনীর মিথ্যাচারে, করে ফেলে পণ।
বাঁধ বুক ত্যজ ভয়, জয় হবে জয়।
আসবে তোমার স্বামী, করিও প্রত্যয়।
রাবণের পরাজয়, আর কিছু দিন।
দিনে দিনে বেড়ে গেছে, যে পাপের ঋণ।
এ নহে প্রলয় ধ্বনি, যুদ্ধের দামামা।
ত্রিজটা রাক্ষসী কহে চিন্তা কেন ওরে।
পীড়িত কমলা তবু, কুণ্ঠিতা অন্তরে।
একধ্যানে সদা প্রাণে, শ্রীরাম শ্রীরাম।
বিরলে বসিলে জল ঝরে অবিরাম।
কেন হৃদয় কু-কথা, কহে বার বার।
নিশিদিন উপবাসে, কাঁদি অনিবার।
অলক্ষে তোমার স্নেহ, আছে অনুক্ষণ।
কি সাধ্য আমার কত করিব বর্ণন।
Comments
Post a Comment