ধৃষ্টদ্যুম্ন



ঋষিশ্রেষ্ঠ ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমে 
দ্রোণ ও পাঞ্চালরাজ প্রষতের পুত্র।
একসাথে বিদ্যাচর্চা, বন্ধুত্বের প্রেমে।
আবেগে দ্রুপদ কহে আমি রাজপুত্র।

প্রতিশ্রুতি দিনু আজ, তোমার আদরে।
রাজা হয়ে, সম্পদ ও সুখের অর্ধেক 
ভাগ করে দিবো যেন, রইলো বিচারে।
দ্রোণকে একথা কহে, শুনিল প্রত্যেক।

কতই সোহাগ করে বসি দুজনায়।
সমুজ্জ্বল শান্তিময়, ঋষির আলয়ে।
ম্রিয়মাণ রবি ছবি, ভুবন জাগায়।
অস্ত্র, বিদ্যা ধর্মশিক্ষা, সকল বিষয়ে।

মনের মধুর জ্যোতি, উছলে নয়নে।
শিক্ষা শেষ হলে পরে, বিদায় চাহিয়া।
বিলোচন ছল ছল করে সেইক্ষণে।
অরণ্য পুরিল বুঝি, কাতরে কাঁদিয়া।

দ্রুপদ হইলো রাজা, বসে সিংহাসনে।
অন্যদিকে দ্রোণ হেথা, চরম দারিদ্র্যে।
তাঁর পুত্র অশ্বত্থামা, চায় মুখ পানে।
দুধের বদলে তারে, ফেন দেয় ভদ্রে।

আননে বচন নাই, নয়নে পলক।
দুঃখের সাগর যেন, উছলে ক্ষুধায়।
যতই সান্ত্বনা করে, মন্দ বলে লোক।
কাতর হয়েছে প্রাণ, মনের ব্যথায়।

অস্ত্র যার কথা শোনে, বিদ্যা শিক্ষা প্রাণ।
তাঁর ঘরে চাল নাই, নাই কোনো ঘর।
পথে পথে দোরে দোরে, ভিক্ষা মেগে খান।
অশান্ত নীরব দ্রোণ, ভাবিল বিস্তর।

বাধ্য হয়ে দ্রোণ যায়, পাঞ্চাল সভায়।
বাল্যবন্ধু দ্রুপদের, পণ মনে করে।
অর্ধেক রাজত্ব তার, পাওনা জানায়।
হাসি মুখে দ্রোণ সেথা কহিল কাতরে।

ঐশ্বর্যের অহংকার, মাতাল দ্রুপদ 
কোথা সেই সুধামাখা, সহাস বয়ান।
দ্রোণকে বুঝিয়ে দেয়, কি দেবে সম্পদ।
চরম অপমানের বোঝা, বিধির বিধান।

"রাজায় রাজায় বন্ধু! ওরে অর্বাচীন।
রাজা আর ভিখারির, বিজন শ্মশান।
নীরবে দাঁড়ায় রয়, এ কেমন দিন।
বন্ধু তারে ভিক্ষা দেয়, করে অপমান।

হেন অপমানে দ্রোণ, রাজসভা ত্যাগে
শপথ নিলেন সেথা, নেবে প্রতিশোধ।
অন্তরাত্মা জর জর, সে ভীষণ রাগে।
দ্রুপদ নেশায় মত্ত, তাঁর নাই বোধ।

কে শেখায় এই ছল, রাজ পরিবারে
ঐশ্বর্যের অহংকার, মায়ার লহরী।
মধ্যদিনের উত্তাপ, অগ্নি পড়ে ঝরে।
অর্থের সন্ধানে দ্রোণ, করে নাকো দেরি।

পরবর্তীকালে দ্রোণ, হস্তিনা নগরে।
কৌরব পাঞ্চব কুলে, হন অস্ত্রগুরু। 
শিক্ষা শেষে দ্রোণাচার্য, চায় দ্রুপদেরে।
গুরুর দক্ষিণা দিবে, এই চায় গুরু।

পাণ্ডবদের বীরত্বে, হইল প্রমাণ।
দ্রুপদের অর্ধরাজ্য দ্রোণ নিলো কেড়ে।
বলেন, "এখন আমি তোমার সমান"
এখন আমরা বন্ধু, হতে পারি কিরে?

পরাজয় ও লাঞ্ছনা, দ্রুপদ হৃদয়ে,
দ্রোণের চেয়েও জ্বালে গভীর আগুন।
পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ নিজের আশ্রয়ে 
মহাযজ্ঞের আগুনে, মহা মহা গুণ।

প্রতিশোধের আগুনে ধৃষ্টদ্যুম্ন আসে।
জন্ম নয় স্বাভাবিক, প্রতিশোধ মানি।
পিতার আকাঙ্ক্ষা তাই জীবন সন্ত্রাসে।
যজ্ঞের আগুন হতে, 

পূর্ণবয়স্ক ও
অবস্ত্রসজ্জিত বীর হিসেবে আবির্ভূত হন। 
অর্থাৎ, তাঁর জীবনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল দ্রোণব'ধ।
ধৃষ্টদ্যুম্নের জন্মের উদ্দেশ্য সর্বজনবিদিত হওয়া সত্ত্বেও দ্রোণাচার্য তাঁকে নিজের আশ্রমে শীর্ষ শিষ্যদের মতোই অস্ত্রশিক্ষা দেন। দ্রোণ জানতেন ধৃষ্টদ্যুম্নই তাঁর মৃবত্যুর কারণ হবেন, তবুও এক মহৎ আচার্যের ধর্ম পালন করে তিনি বিন্দুমাত্র বৈষম্য করেননি এবং শিষ্যকে নিজের সেরা বিদ্যা দান করেছিলেন।

ধর্মের পথে থেকেও অধর্ম: কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ধৃষ্টদ্যুম্ন ছিলেন পান্ডব পক্ষের প্রধান সেনাপতি। পান্ডবদের অর্থাৎ 'ধর্মের' পক্ষে যুদ্ধ করা সত্ত্বেও, গুরু দ্রোণাচার্যকে হ'ত্যা করার সময় তিনি যুদ্ধনীতির কঠোর লঙ্ঘন করেন। অশ্বত্থামার মৃ'ত্যুর অসত্য সংবাদে শোকাচ্ছন্ন ও অস্ত্রত্যাগী দ্রোণাচার্য যখন ধ্যানে মগ্ন, তখন ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁর শিরশ্ছেদ করেন। নিরস্ত্র ও ধ্যানস্থ গুরুকে হ'ত্যা করা নীতি ও ধর্মের দৃষ্টিতে ঘোর অধর্ম ছিল।

পিতা দ্রুপদ নিজের প্রতিশো'ধের আকাঙ্ক্ষা মেটাতে গিয়ে পুত্রকে এমন এক নিয়তির মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন, যা তাঁকে শেষপর্যন্ত চরম অপমানিত করেছিল। যুদ্ধের ময়দানে বীরের বীরগতিলাভের অধিকারটুকুও পিতা তাঁর ভাগ্যে রাখেননি। অশ্বত্থামার হাতে ঘুমন্ত অবস্থায় পশুর মতো নিহ'ত হওয়া ছিল পিতার সেই অন্ধ প্রতিশো'ধের আগুনেরই শেষ ভস্মীভূত রূপ।

পিতা দ্রুপদ ধৃষ্টদ্যুম্নকে সৃষ্টি করেছিলেন কেবল নিজের অপমান ধোয়ার জন্য। তিনি পুত্রকে একটি বীরদেহে প্রাণ দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর স্বকীয়তা, তাঁর শান্তি এবং তাঁর মানবিক অধিকার কেড়ে নিয়ে লিখে দিয়েছিলেন শুধুই চরম দুর্ভাবগ্য ও বঞ্চ'না।

Comments

Popular posts from this blog

দাসত্ব

কলহ

দীনবন্ধু মিত্র