সুর্পনক্ষা


রাক্ষসী শূর্পনখা

আহা রে পুরুষবর বহে স্নিগ্ধ সমীরণ।
কে গো এই বনবাসি, জটাজুট কেশ রাশি
ওহো, এই হৃদিরাজ্যে প্রেম করে আগমন।
চন্দ্রপ্রভা চোখের পলকে, ঝরে পড়ে শশী।

মজেছি তোমার ধ্যানে, আমি প্রেম অভিলাষী।
তোমার চোখের দীপ্তি, অভিনব শান্তিরসে তব।
নীরবে এই হরিণী কহে, তোরে ভালোবাসি।
যতদিন প্রাণ রবে দেহে। তোমারই হয়ে রব।

সবুজে তরুণ ঊষা, আনন্দে অধীর প্রাণ।
রূপে মন ভরে রাখো, নিরখি কমলবনে।
শূর্পনখার হৃদয় লাগে যে, রাম প্রেম বাণ।
একাকী বনের মাঝে সুর্পনখা আনমনে।

রাক্ষসী রূপের বাধা, দূর করে শূর্পনখা।
অতীব সুন্দরী, শূর্পনখা, নারী রূপে জাগে। 
অধরে প্রেমের হাসি, মিলনে মধুর সখা।
প্রেমিকারহণে চলে যুবতী প্রেমপূর্ণরাগে। 

ত্রিলোক বিজয়ী লঙ্কেশ্বর তাঁর আদরিণী।
বলিহারি মদনের বাণ, অনল জ্বলিয়ে।
বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে চলে যে বিনোদিনী 
বনবাসী, কোথা হতে এলে ঘোর সমুদয়ে। 

শান্ত স্নিগ্ধ তৃপ্তিময় প্রভা ভুলায় নয়ন।
পদত্রাণহীন, এই ঘোর অরণ্য গভীরে।
কি নাম তোমার বনবাসী, জ্বলন্ত তপন।
তোমার তাপে মোর, প্রেম জাগে অন্তরে।

এত রূপ ছিল কোন কুলে কার বংশধর।
কথা হতে আসিয়াছ, কি নাম বলো উদাস।
শ্রীরামের হাসি মুখ, যেন দেখি চন্দ্রকর।
তারকা ছড়ানো যেন, রোমাঞ্চিত নীলাকাশ।

কর্ণে কিরণের ফুল, দোদুল চঞ্চল কেশ।
একাকিনী বনাঞ্চলে, কি চাহ আসিয়া।
গন্ধর্ব কন্যা না কোনো অপ্সরার ছদ্মবেশ।
দশরথ পুত্র আমি, বনমাঝে পঞ্চবটিতে।

সে তুমি যেই হও, না মানি আমি কোনো বাধা।
তোমার আকর্ষণে মুগ্ধ, দশানন ভগিনী।
শুভ পরিণয় হবে মোর, পাবো অমৃত সুধা।
এসো আলিঙ্গন করি, তৃপ্ত করি কুহকিনী।

আরে আরে তিষ্ঠ এক্ষণে, দশনন ভগিনী।
বিবাহিত আমি, কেন এত তৎপর রূপসী।
অর্ধাঙ্গিনী আছে মোর, দেখো জনক নন্দিনী।
অজানু লম্বিত কেশ, জোছনায় পূর্ণ শশী।

আকুল ব্যাকুল হৃদি মিলিবারে ধাবমান।
অধরে প্রেমের হাসি বিষাদে মলিন মুখ।
রামের প্রতি প্রেম প্রীতি, শূর্পনখা প্রাণ।
শুনে সে রামের বয়ান, বিদরে তার বুক।

ওহে দশরথ পুত্র, মোহিত তোমার রূপে।
বিবাহ করিতে কি এমন বাধা তোমার?
দশরথের তিন ভার্যা, নিত্য যোগিনী রূপে।
কৌশল্যা কৈকেয়ী সুমিত্রাও সেবা করে তার ।

তবে কেন অবহেলা করো রাম রুঘুপতি।
পঞ্চবটী তলে হেরে মোরে গুল্ম তরুলতা।
ছিন্নভিন্ন করো এবে, মোর প্রেম পূর্ণ প্রীতি।
সানন্দে সহাস্য প্রত্যাখ্যানে করো চপলতা।

চপল হাসিতে রাম কহিল শূর্পনখাকে।
আমারতো স্ত্রী আছে সীতা, আমার অর্ধাগিনী।
প্রেমের প্রস্তাব শুধু কেন দাও গো আমাকে?
সেই দেখো কনিষ্ঠ ভ্রাতা, লক্ষণ শিরোমণি।

তীরধনু স্কন্ধে তার, সৌম্যকান্তি দেহ যার।
ব্যঙ্গচ্ছলে কহো গিয়ে মনের অভিলাষ ।
গগনের চাঁদ পাবে, তারে দেখ একবার।
মুগ্ধ হয়ে রূপ রসে, দাও তারে স্নিগ্ধ শ্বাস।

রূপসী রাক্ষ'সী ভাসে লক্ষণের রূপ দেখে 
মোহিত হয়ে তাকেও দেয় বিয়ের প্রস্তাব। 
তিনিও যে বিবাহিত, কহিল  হাস্য মুখে ।
অভিমানে অপমানে সেও, বোঝে মনোভাব।

কৌতুকবশত রাম তাকে, পাঠালো যখন
লক্ষ্মণও যে অনাদরে করিল প্রত্যাখ্যান।
প্রতিবার রাম কহে সীতা আছে যখন 
কেমনে যে করিব বিবাহ পাপের সমান।

বরংবার প্রত্যাখ্যনে বিরক্ত সুর্পনখা 
লক্ষ্মণও শ্রীরামের এক অনুগত দাস।
পুনরায় শ্রীরামের সঙ্গেও করে দেখা।
পরপর প্রত্যাখ্যানে মনে ক্রোধ করে বাস।

প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে সুর্পনখা ভাবে মনে মনে,
সীতার কারণে রাম তাকে, না করে গ্রহণ।
সীতার ওপর হামলা চালায় আক্রমনে।
জানকীরে হ'ত্যা করে, করিবে ভক্ষণ 

শূর্পনখার হিংস্র রূপ, দেখে সীতামাতা।
বারবার অনুরোধে মানে না শূর্পনখা।
অত্যন্ত ভয় পেয়ে, ডাকে লক্ষণ ভ্রাতা।
লক্ষণের হুংকারে যেই ঘোরে শূর্পনখা।

শূর্পনখার নাকের ওপর করিল আঘাত।
শূর্পনখার বড় নাক পড়িল ভূমি পরে।
অপমানে শূর্পনখা নাকে দিলো হাত।
শূর্পনখার নাক কেটে রক্ত পড়ে ঝরে।

উপযুক্ত শাস্তি পেয়ে, ছাড়িল ছদ্মবেশ।
কদাকার রাক্ষসী রূপে সে ভয়ঙ্কর অতি।
দ্রুত গেলো বীর ভ্রাতা দশাননের দেশ।
শ্রীরাম লক্ষ্মনের আর, কে করবে ক্ষতি ?

অস্তাচলে চলিল তপন, নিশার আগমনে।
তিমিরে পূরিল বিশ্ব অস্থির হইল লক্ষণ।
কি করিল কেন হইল তার, এমন আচরণে।
এর থেকে ভালো ছিল, যদি করিত নিধন।

স্ত্রী জাতির উপরে তার এ কেমন আচরণ?
কেনই বা শ্রীরামের আদেশের এমন ধরন।
ইতিহাসে লেখা রবে, এ অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষণ।
বিচিত্র এ নিয়তি কি আর, করিবে বর্জন।


 

Comments

Popular posts from this blog

দাসত্ব

কলহ

দীনবন্ধু মিত্র