শকুন্তলা

শকুন্তলা

নারায়ণ, নরোত্তম নর ও দেবী সরস্বতীকে নমস্কার করে তারপর জয় উচ্চারণ করছি।

কুলপতি মহর্ষি শৌনক নৈমিষারণ্যে দ্বাদশ বার্ষিক যজ্ঞ করছিলেন। একদিন লোমহর্ষণের পুত্র পুরাণকথক সৌতি (৩) সেখানে বিনীতভাবে উপস্থিত হলেন। আশ্রমের মুনিরা তাকে প্রশ্ন করলেন, সৌতি, তুমি এখন কোথা থেকে আসছ, এতকাল কোথায় ছিলে ? সৌতি উত্তর দিলেন, আমি রাজর্ষি জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞে ছিলাম, সেখানে কৃষ্ণদ্বৈপায়নরচিত বিচিত্র মহাভারতকথা বৈশম্পায়নের মুখে শুনেছি। তার পর বহু তীর্থে ভ্রমণ করে সমস্তপঞ্চক দেশে যাই, যেখানে কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধ হয়েছিল। এখন আপনাদের দর্শন করতে এখানে এসেছি। দ্বিজগণ, আপনারা যজ্ঞে আহুতি দিয়ে শুচি হয়ে সুখে উপবিষ্ট রয়েছেন, আমার কাছে কি শুনতে ইচ্ছা করেন আদেশ করুন—পবিত্র পুরাণকথা, না মহাত্মা নরপতি ও ঋষিগণের ইতিহাস? ঋষিরা বললেন, রাজা জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞে বৈশম্পায়ন যে ব্যাসরচিত মহাভারতকথা বলেছিলেন আমার তাই শুনতে ইচ্ছা করি।

সৌতি বললেন, চরাচরগুরু হৃষীকেশ হরিকে নমস্কার করে আমি ব্যাসপ্রোক্ত মহাভারতকথা আরম্ভ করছি। কয়েকজন কবি এই ইতিহাস পূর্বে বলে গেছেন, এখন অপর কবিরা বলছেন, আবার ভবিষ্যতে অন্য কবিরাও বলবেন। ব্যাসদেব এই মহাভারত সংক্ষেপে বলেছেন আবার সবিস্তারেও বলেছেন। কোনও কোনও ব্রাহ্মণ এই গ্রন্থ আদি থেকে, কেউ আস্তীকের উপাখ্যান থেকে, কেউ বা উপরিচরের উপাখ্যান থেকে পাঠ করেন।
পরীক্ষিৎ-সুত, কহে ওহে মুনিবর।
ভরত-বংশের কথা শুনিব এখন।
পুরাকালে মহারাজা, ভরত কোঙর।
কেমন ছিলেন তিনি, করুন বর্ণন।


দুষ্মন্ত নামেতে রাজা জগতে বিদিত।
তাঁহার মহিমা কথা না হয় বর্ণিত।।
সংসারে আসিয়া বসুন্ধরা ভোগ করে।
ধর্ম্মেতে পৃথিবী পালে, দুষ্টেরে সংহারে।।
মহা পরাক্রান্ত রাজা রূপগুণবন্ত।
পৃথিবীতে একচ্ছত্র করিল দুষ্মন্ত।।
মৃগরাতে বড় রত মহাধনুর্দ্ধর।
মৃগয়া করিতে গেল বনের ভিতর।।
হস্তী হয় পদাতিক না যায় গণন।
সসৈন্যে বেড়িল রাজা এক মহাবন।।
সিংহ ব্যাঘ্র ভল্লুক বরাহ মৃগগণ।
অনেক মারিল রাজা না যায় গণন।।
যতেক রাজার সৈন্য মারি মৃগচয়।
শকটে পূরিল কেহ কান্ধে করি লয়।।
কোন কোন জন তথা খায় পুড়াইয়া।
তবে এক বনে গেল সে বন ছাড়িয়া।।
হিরণ্য নামেতে বন অতি মনোরম।
চৈতরথ সমান সে মুনির আশ্রম।।
নানাজাতি বৃক্ষ তথা ফুল ফল ধরে।
নানাজাতি পক্ষী তথা সদা কেলি করে।।
মধুচক্র ডালে ডালে আছে তরুগণে।
বায়ুতেজে পুষ্পবৃষ্টি হয় অনুক্ষণে।।
নানা পক্ষিগণ তাহে সদা ক্রীড়া করে।
ভক্ষকে না করে ভক্ষ্য মুনিরাজ ডরে।।
মালিনী নামেতে নদী দেখিয়া নিকটে।
মুনিগণ বৈসেন তাহার দুই তটে।।
অগ্নিহোত্র ধূম গিয়া পরশে গগন।
ব্রহ্মার বদনে যেন বেদ উচ্চারণ।।
মুনির আশ্রম বুঝি দুষ্মন্ত নৃপতি।
ডাকিয়া বলেন রাজা সৈন্যগণ প্রতি।।
মুনি সম্ভাষিয়া আমি না আসি যাবৎ।
এইখানে সর্ব্বজন থাকহ তাবৎ।।
এত বলি নরপতি পুরোহিত লৈয়া।
কণ্বের আশ্রমে রাজা উত্তরিল গিয়া।।
প্রবেশ করিল গিয়া মুনি অন্তঃপুর।
দেখিল সে কণ্ব নাই, চিন্তে নৃপবর।।
হেনকালে শকুন্তলা মুনির নন্দিনী।
পাদ্য অর্ঘ্য দিয়া তুষ্ট কৈল নৃপমণি।।
দেখিয়া কন্যার রূপ নৃপতি মোহিত।
জিজ্জাসিল কন্যা প্রতি হয়ে বিমোহিত।।
দুষ্মন্ত নৃপতি আমি শুন সুবদনি।
হেথা আইলাম আমি ভেটিবারে মুনি।।
কোথায় গেলেন মুনি কহত সুন্দরি।
তুমি বা কাহার কন্যা কহ সত্য করি।।
কন্যা বলে, গেল পিতা ফলের কারণ।
মুহূর্ত্তেক রহ হেথা, আসিবে এখন।।
মুনির নন্দিনী আমি, শুন নৃপবর।
এত শুনি নরপতি করিল উত্তর।।
তোমার সদৃশ রূপ কোথাও না দেখি।
মুনিকন্যা সত্য তুমি কহ শশিমুখি।।
পরম তপস্বী মুনি ফল মূলাহারী।
দারত্যাগী জিতেন্দ্রিয় মহা ব্রহ্মচারী।।
তাঁহার তনয়া তুমি হইলা কি মতে।
কত সত্য সুবদনি আমার সাক্ষাতে।।
কন্যা বলে, শুন মম জন্মের কাহিনী।
যেমতে হইনু আমি মুনির নন্দিনী।।
বিশ্বামিত্র মুনি জান বিখ্যাত সংসারে।
চিরদিন তপস্যা করেন অনাহারে।।
তাঁর তপ দেখি কম্পমান পুরন্দর।
আমার ইন্দ্রত্ব লবে এই মুনিবর।।
সর্ব্ব দেবগণ মিলি ভাবে নিরন্তর।
মেনকারে ডাকি বলে দেব পুরন্দর।।
রূপে গুণে তব তুল্য নাহি ত্রিভুবনে।
মম কার্য্য সিদ্ধ কর আপনার গুণে।।
বিশ্বামিত্র তপেতে কম্পিত মম কায়।
তাঁর তপ ভঙ্গ কর করিয়া উপায়।।
শুনিয়া মেনকা অতি বিষণ্ন বদন।
যোড় হাত করি ইন্দ্রে করে নিবেদন।।
সংসারে বিখ্যাত বিশ্বামিত্র মহাঋষি।
মহাতেজা ক্রোধী সেই পরম তপস্বী।।
বশিষ্ঠের শত পুত্র প্রকারে মারিল।
ক্ষত্রকুলে জন্মি তবু ব্রাহ্মণ হইল।।
কৌশিকী নামেতে নদী আজ্ঞাতে সৃজিল।
সহজাঙ্গে ব্যাধি করি পুনর্মুক্ত কৈল।।
দ্বিতীয় করিল সৃষ্টি বিখ্যাত জগতে।
আপনি করহ ভয় যাঁহার তপেতে।।
তাঁর তপ নষ্ট করে হেন কোন্ জন।
কর্ম্ম না হইবে, হৈবে আমার মরণ।।
অগ্নি সূর্য্য সম তেজ লোচন যুগলে।
তাঁহার তপস্যা ভঙ্গ করি কোন্ ছলে।।
তোমার বচন আমি লঙ্ঘিবারে নারি।
তব কার্য্য সিদ্ধ হৌক, আমি বাঁচি মরি।।
কামদেব আর বায়ু দেহ তো সহায়।
তবে যেমনেতে হয়, করিব উপায়।।
ইন্দ্র আজ্ঞা কৈল সঙ্গে যাহ দুইজন।
দেবরাজ আজ্ঞা পেয়ে চলিল তখন।।
হেমন্ত পর্ব্বতে বৈসে সেই মুনিবর।
মুনি দেখি মেনকার কাঁপির অন্তর।।
অতিশয় সুবেশা হইয়া বিদ্যাধরী।
মুনির নিকটে ক্রীড়া করে মায়া করি।।
হেনকালে বায়ু বহে অতি খরতর।
উড়াইয়া বস্ত্র তার ফেলিল অন্তর।।
আস্তে ব্যস্তে মেনকা উঠিয়া বস্ত্র ধরে।
বিবিধ প্রকারে পবনেরে নিন্দা করে।।
এ সকল কৌতুক দেখিল মুনিবর।
শরীরেতে ভেদিল কামের পঞ্চশর।।
মেনকা ধরিয়া মুনি গেল নিজ দেশ।
কামে মত্ত নিত্য করে শৃঙ্গার বিশেষ।।
হেনমতে বহুদিন গেল ক্রীড়ারসে।
তপ জপ সকল ত্যজিল কামবশে।।
একদিন সন্ধ্যাকালে বিশ্বামিত্র মুনি।
সন্ধ্যা হেতু বলে শীঘ্র জল দেহ আনি।।
শুনিয়া মেনকা হাসি বলিল বচন।
এতদিনে ভাল সন্ধ্যা হইল স্মরণ।।
এত শুনি মুনি হৈল কুপিত অন্তর।
দেখিয়া মেনকা ভয়ে পলায় সত্বর।।
হৈয়াছিল যেই গর্ভ মুনির ঔরসে।
অরণ্যে প্রসব করি গেল নিজ দেশে।।
মুনি তপ নষ্ট করি গেল নিজ স্থানে।
আমারে ফেলিয়া গেল নির্জ্জন কাননে।।
সিংহ ব্যাঘ্র পশুগণ কেহ না হিংসিল।
পক্ষীগণ বেড়িয়া যে আমারে রহিল।।
তপস্যা করিতে গেল কণ্ব সেই বনে।
অনাথা দেখিয়া তাঁর দয়া হৈল মনে।।
গৃহে আমি পালন করিল মুনিবর।
তাই আমি তাঁর কন্যা, শুন দণ্ডধর।।
শকুন্তে বেড়িয়াছিল নিকুঞ্জ কাননে।
শকুন্তলা নাম মুনি রাখে সে কারণে।।
মম জন্মকথা এক মুনি জিজ্ঞাসিল।
কহিলেন কণ্ব তাঁরে তাহে জানা গেল।।
আদিপর্ব্বে দিব্য শকুন্তলা উপাখ্যান।
কাশীরাম দাস কহে শুনে পুণ্যবান।।

রাজা বলে, কন্যা তুমি পরমা সুন্দরী।
রাজযোগ্যা ধনি তুমি হও মোর নারী।।
গাছের বাকল ত্যাজি পর পট্টবাস।
রত্ন-অলঙ্কার পর যেই অভিলাষ।।
এত শুনি লজ্জিতা হইয়া শকুন্তলা।
মৃদুভাষে নৃপতিকে কহিতে লাগিলা।।
শুন রাজা আমি করিলাম অঙ্গীকার।
পিতা আসি সম্প্রদান করিবে আমার।।
রাজা বলে, মুনিবর বিলম্বে আসিবে।
ক্ষণেক বিলম্ব হৈলে মম মৃত্যু হৈবে।।
বেদোক্ত বিবাহ হয় অষ্টম প্রকার।
গান্ধর্ব্ব বিবাহ লিখে ক্ষত্রিয় আচার।।
আপনি বিবাহ কর যদ্যপি আমারে।
মুনির বচনে দোষ না হৈবে তোমারে।।
রাজার বিনয় বাক্য শকুন্তলা শুনি।
রাজারে বলিল সত্য কর নৃপমণি।।
বেদের বিহিত যদি আছে পূর্ব্বাপর।
গান্ধর্ব্ব বিবাহ হৈবে শুন নৃপবর।।
আমার উদরে যেই জন্মিবে কুমার।
সত্য কর তুমি তারে দিবে রাজ্যভার।।
কামে মত্ত ভূপতি করিল অঙ্গীকার।
গান্ধর্ব্ব বিবাহে হৈল মিলন দোঁহার।।
তবে নরপতি বলে কন্যারে চাহিয়া।
রাজ্যেতে লইব তোমা লোক পাঠাইয়া।।
এত বলি নরপতি করিল গমন।
পথে যেতে নরপতি ভাবে মনে মন।।
কি বলিবে মুনিরাজ আসি নিজ ঘরে।
দুষ্মন্ত নিতান্ত ভীত ভাবিয়া অন্তরে।।
সসৈন্যে আপন দেশে গেল নরপতি।
কতক্ষণে গৃহে এল মুনি মহামতি।।
স্কন্ধ হৈতে ফলভার ভূমিতে থুইল।
শকুন্তলা এস বলি মুনি ডাক দিল।।
লজ্জায় মলিন কন্যা কন্যা না হৈল বাহির।
দেখিয়া বিস্মিত চিত্ত হইল মুনির।।
ধ্যানেতে জানিল মুনি যত বিবরণ।
হাসিয়া কন্যার প্রতি বলিল বচন।।
আমারে হেলন করি কৈলা এই কর্ম্ম।
দুষ্মন্ত নৃপতি সহ করিলা অধর্ম্ম।।
ক্ষমিলাম তোরে আমি করেছি পালন।
না করিহ ভয় চিত্তে, স্থির কর মন।।
সবিনয়ে বলে কন্যা যুড়ি দুই কর।
করিনু দুষ্কর্ম্ম মোরে ক্ষম মুনিবর।।
যোগ্য পাত্র সেই সে দুষ্মন্ত নৃপবর।
গান্ধর্ব্ব বিবাহে তারে করিলাম বর।।
ক্ষমহ রাজার দোষ আমারে দেখিয়া।
এত শুনি মুনিবর বলিল হাসিয়া।।
ক্ষমিলাম নৃপতিরে তোমার কারণ।
ইচ্ছামত বর তুমি করহ প্রার্থনা।।
ইহা শুনি অতি ধীরে শকুন্তলা কয়।
বাঞ্ছা যদি বর দিবে পিতা মহাশয়।।
প্রসন্ন হইয়া তুমি বর দেহ তবে।
অতুল প্রতাপে ধরা শাসুক গৌরবে।।
রাজ্যচ্যুত অথবা অধর্ম্ম পরায়ণ।
পুরু বংশীয়েরা যেন না হয় কখন।।
শকুন্তলা মুখে তবে শুনি এই বাণী।
তথাস্তু বলিয়া বর দিলা মহামুনি।।
হেনমতে মুনি-গৃহে আছে শকুন্তলা।
বিস্মৃত হইলা রাজা রাজভোগে ভোলা।।
কতকালে প্রসব হইল শকুন্তলা।
পরম সুন্দর পুত্র, শশী ষোলকলা।।
দিনে দিনে বাড়ে পুত্র মুনির ভবনে।
ছয় বর্ষ পূর্ণ হৈল রাজা নাহি জানে।।
মহা পরাক্রান্ত-বীর হৈল শিশুকালে।
সিংহ ব্যাঘ্র হস্তী ধরি আনে পালে পালে।।
তার পরাক্রম দেখি মুনি চমৎকার।
দমনক বলি নাম দিলেন তাহার।।
শকুন্তলা সহ মুনি করিল বিচার।
যুবরাজ-যোগ্য পুত্র হইল তোমার।।
পুত্র সহ যাহ তুমি রাজার আলয়।
পিতৃগৃহে কন্যা কভু সম্ভব না হয়।।
ধর্ম্মক্ষয় অপযশ হয় কুচরিত্র।
পিতৃগৃহে বহু ধর্ম্মেনা হয় পবিত্র।।
এত বলি শিষ্য এক দিলেন সংহতি।
পুত্র সহ পাঠাইলা যথা নরপতি।।
দুষ্মন্ত নৃপতি বৈসে হস্তিনা নগর।
শকুন্তলা গেল যথা আছে নৃপবর।।
পাত্রমিত্র সহ রাজা আছেন বসিয়া।
পুত্র আগে করি তথা উত্তরিল গিয়া।।
রাজারে চাহিয়া শকুন্তলা কহে বাণী।
এই পুত্র তোমার, দেখহ নৃপমণি।।
পূর্ব্বের প্রতিজ্ঞা রাজা করহ স্মরণ।
তপোবনে গিয়াছিলে মৃগয়া কারণ।।
আপনার সত্য রাজা করহ পালন।
পুত্রে কোলে করি রাজা তোষ মম মন।।
শুনি সভাসদ-লোক বিস্ময় অন্তর।
হাসিয়া দুষ্মন্ত রাজা করিল উত্তর।।
কোথাকার তপস্বিনী কাহার নন্দিনী।
কোনকালে পরিচয় আমি নাহি জানি।।
এত শুনি শকুন্তলা হইলা লজ্জিত।
ক্রোধেতে অধর ওষ্ঠ সঘনে কম্পিত।।
পুনঃ ক্রোধ সম্বরিয়া বলে শকুন্তলা।
পূর্ব্বসত্য পাসরিলা রাজভোগে ভোলা।।
কি বাক্য বলিলা রাজা, নাহি ধর্ম্ম ভয়।
তুমি হেন মিথ্যা বল, উচিত না হয়।।
দৈবে সেই সব কথা কেহ নাহি জানে।
আপনি ভাবিয়া রাজা দেখ মনে মনে।।
জানিয়া শুনিয়া মিথ্যা কহে যেই জন।
সহস্র বৎসর হয় নরকে গমন।।
লুকাইয়া যেই জন করে পাপ কর্ম্ম।
লোকে না জানিল কিন্তু জানিল যে ধর্ম্ম।।
চন্দ্র সূর্য্য বায়ু অগ্নি মহী আর জল।
আকাশ শমন ধর্ম্ম জানয়ে সকল।।
দিবা রাত্রি সন্ধ্যা প্রাতঃ বালবৃদ্ধ জানে।
ধর্ম্মাধর্ম্ম ফল তারে দেয় ত শমনে।।
মিথ্যা হেন বল রাজা, কভু ভাল নহে।
মিথ্যা হেন পাপ নাহি, সর্ব্বশাস্ত্রে কহে।।
পতিব্রতা নারী আমি, না কর হেলন।
আমারে নীচের প্রায় না ভাব রাজন।।
পুত্ররূপে জন্মে পিতা ভার্য্যার উদরে।
শাস্ত্রেতে প্রমাণ আছে জানে চরাচরে।।
সে কারণে ভার্য্যারে জননী সমা দেখি।
করিলা বিস্তর দোষ আমারে উপেক্ষি।।
অর্দ্ধেক শরীর ভার্য্যা, সর্ব্ব শাস্ত্রে লেখে।
ভার্য্যা সম বন্ধু রাজা নাহি কোন লোকে।।
পরম সহায় হয় পতিব্রতা নারী।
যাহার সহায়ে রাজা সর্ব্ব ধর্ম্ম করি।।
ভার্য্যা বিনা গৃহ শূন্য অরণ্যের প্রায়।
বনে ভার্য্যা সঙ্গে থাকে গৃহস্থ বলায়।।
ভার্য্যাহীন লোকে কেহ না করে বিশ্বাস।
সর্ব্বদা দুঃখিত সেই সর্ব্বদা উদাস।।
ভার্য্যাবন্ত লোক ইহকাল বঞ্চে সুখে।
মরণে সংহতি হৈয়া তারে পরলোকে।।
স্বামীর জীবনে ভার্য্যা আগে যদি মরে।
পথ চাহি থাকে ভার্য্যা স্বামী অনুসারে।।
মরিলে স্বামীরে উদ্ধারিয়া লয় স্বর্গে।
হেন নীতিশাস্ত্র রাজা কহে সুরবর্গে।।
ভার্য্যা বিনা পুত্র করে কাহার শকতি।
দেব ঋষি মুনি আদি যত মহামতি।।
পুত্রের সমান রাজা নাহিক সংসারে।
জন্মমাত্র মুখ দেখি পিতামাতা তরে।।
পিণ্ডদান পুত্র তার করয়ে উদ্ধার।
হেন নীতি কহে রাজা বেদেতে প্রচার।।
চতুষ্পদে গাভী শ্রেষ্ঠ, দ্বিপদে ব্রাহ্মণে।
অধ্যায়নে গুরু শ্রেষ্ঠ, পুত্র আলিঙ্গনে।।
ধূলায় ধূসর পুত্রে করি আলিঙ্গন।
হৃদয়ের সর্ব্বদুঃখ হয় ত খণ্ডন।।
হেন পুত্র দাঁড়াইয়া তোমার সম্মুখে।
আলিঙ্গন করে রাজা পরম কৌতুকে।।
অবজ্ঞা না কর রাজা, নীচ পুত্র নহে।
ইহার মহিমা যত মুনিগণ কহে।।
শত শত করিবেক অশ্বমেধ যাগ।
সসাগরা ধরার লইবে রাজ্যভাগ।।
উজ্জ্বল করিবে বংশ এই ত নন্দন।
প্রত্যক্ষে দেখহ রাজা দ্বিতীয় তপন।।
পিতার হতাশে পুত্র সদা ভাবে দুখ।
সে কারণে দেখিতে আইল তব মুখ।।
আলিঙ্গন দিয়া তোষ আপন কুমারে।
দুঃখ নাহি ত্যজ কিবা রাখহ আমারে।।
বিশ্বামিত্র পিতা মোর, মেনকা জননী।
প্রসবিয়া বনে গেল থুয়ে একাকিনী।।
জননী ত্যজিল পূর্ব্বে, তুমি ত্যজ এবে।
তোমারে বলিব কি মরিব এই ভেবে।।
নিশ্চয় মরিব আমি, নাহি তাহে দুঃখ।
এ পুত্র বিচ্ছেদে মোর বিদরিছে বুক।।
শকুন্তলা এত যদি বিনয় করির।
শুনিয়া নৃপতি তবে প্রত্যুত্তর দিল।।
অকারণে পুনঃ পুনঃ কহ কি আমারে।
তোমার বচন শুনি কেবা শ্রদ্ধা করে।।
তোমার জনক যদি বিশ্বামিত্র মুনি।
মেনকা অপ্সরী হয় তোমার জননী।।
বিশ্বামিত্র লোভী বলি জানে ত্রিজগতে।
জন্মিয়া ক্ষত্রিয়কুলে গেল বিপ্র-পথে।।
মেনকা কেমন নারী কেবা নাহি জানে।
মায়ের প্রকৃতি তোর খণ্ডিবে কেমনে।।
নিশ্চয় মায়ের মত তোমার প্রকৃতি।
এই পুত্র সেই মত, লয় মোর মতি।।
মিথ্যা প্রবঞ্চনা করি প্রতার আমারে।
যাহ কিম্বা থাক, কেহ না জিজ্ঞাসে তোরে।।
শকুন্তলা কহে, রাজা কহ বিপরীত।
দেবলোকে নিন্দা কর, নহে ত উচিত।।
মেনকা অপ্সরা, তারে পূজে দেবগণে।
বিশ্বামিত্র মহাঋষি, কেবা নাহি জানে।।
তোমায় আমায় রাজা অনেক অন্তর।
সুমেরু সরিষা হতে যত বৃহত্তর।।
মম মাতা স্বর্গবাসী, তুমি বৈস ক্ষিতি।
স্বর্গে মর্ত্ত্যে সমতুল কর নরপতি।।
আমার দেখহ শক্তি আপন নয়নে।
এখনি যাইতে পারি যথা ইচ্ছা মনে।।
ইন্দ্র যম কুবের ভুবন আদি করি।
মুহূর্ত্তেকে চরাচর ভ্রমিবারে পারি।।
যত নিন্দা কর, সহি স্বামীর কারণে।
আপনা না জান, নিন্দা কর অন্য জনে।।
কুরূপ মনুষ্য রাজা নিন্দে সর্ব্বলোকে।
যতক্ষণ দর্পণে না নিজ মুখ দেখে।।
সত্য সম পুণ্য রাজা নাহিক তুলনা।
মিথ্যা হেন পাপ নাহি কহে মুনি জনা।।
হেন মিথ্যাবাদী তুমি হইলে নিশ্চয়।
তোমার এখানে থাকা উচিত না হয়।।
এত বলি শকুন্তলা চলিল সত্বর।
হেনকালে শব্দ হয় আকাশ উপর।।
সত্য কথা সকলি কহিল শকুন্তলা।
শকুন্তলা বাক্য রাজা না করিও হেলা।।
সতী পতিব্রতা এই তোমার ক্ষমিল।
শকুন্তলা-ক্রোধে তব নাহি হৈবে ভাল।।
বংশের তিলক রাজা এই যে নন্দন।
আমার বচনে কর রক্ষণ ভরণ।।
ভরত বলিয়া নাম রাখহ ইহার।
ইহা হৈতে বংশোজ্জ্বল হইবে তোমার।।
দুষ্মন্ত নৃপতি শুনে মন্ত্রী পুরোহিত।
এতেক আকাশবাণী হৈল আচম্বিত।।
রাজা বলে, মন্ত্রিগণ করিলা শ্রবণ।
সকলি ত জানি আমি, নহি বিস্মরণ।।
জানিয়া না জানি আমি, লোকাচারে ডরি।
লোকে বলিবেক এই লোকাচারে ডরি।
লোকে বলিবেক এই কোথাকার নারী।।
এ কারণে আমি ভাণ্ডিলাম মন্ত্রিগণে।
বেশ্যা বলি ইহারে জানিল সর্ব্বজনে।।
এত বলি শীঘ্র উঠি দুষ্মন্ত রাজন।
শকুন্তলা হস্তে ধরি ফিরান তখন।।
মহানন্দে নরপতি পুত্র লৈল কোলে।
শত শত চুম্ব দিল বদন কমলে।।
শকুন্তলায় করিল রাজ-পাটেশ্বরী।
পরম কৌতুকে চিরদিন রাজ্য করি।।
কতদিনে বৃদ্ধকালে দুষ্মন্ত রাজন।
ভরতের রাজ্যে দিয়া গেল তপোবন।।
পৃথিবীতে মহারাজ হইল ভরত।
অশ্বমেধ যজ্ঞ আদি করে শত শত।।
লক্ষ পদ্ম সুবর্ণ ব্রাহ্মণে দিল দান।
দাতা যে নাহিক কেহ ভরত সমান।।
সসাগরা পৃথিবী শাসিল ভুজবলে।
অদ্যাপি ভারতভূমি ঘোষে ভূমণ্ডলে।।
তাঁর বংশে যতজন হইল নরপতি।
ভরতের বংশ বলি পাইল সুখ্যাতি।।
ভরতের উপাখ্যান যেই নর শুনে।
আয়ুর্যশ-পুণ্য তার বাড়ে দিনে দিনে।।
আদিপর্ব্ব ভারত রচিল বেদব্যাস।
পাঁচালী প্রবন্ধে কহে কাশীরাম দাস।।

Comments

Popular posts from this blog

দাসত্ব

কলহ

দীনবন্ধু মিত্র