সাহেব

পাড়ার এক পরিচিত মানুষ হঠাৎ এসে বললেন, “একটু সাহায্য করবে?” কাজটা খুব বড় নয়। নিজের কাজ ফেলে আধ ঘণ্টা সময় দিলেই হয়ে যাবে। তিনি রাজি হয়ে গেলেন। এমনটা আগেও হয়েছে। কারও প্রয়োজন, কারও অসুবিধা, কারও অনুরোধ—‘না’ বলতে তাঁর কেমন যেন অস্বস্তি হয়। সেদিনও নিজের কিছু জরুরি কাজ পিছিয়ে দিয়ে অন্যের কাজটা করে দিলেন। সন্ধ্যায় যখন নিজের অসমাপ্ত কাজগুলোর দিকে তাকালেন, তখন মনে হল—অন্যের জন্য এত কিছু করতে করতে নিজের জীবনটার জন্যই কি সময় কমে যাচ্ছে?

ভালো মানুষ হওয়ার একটি অদ্ভুত সামাজিক চাপ আছে। ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়—অন্যকে সাহায্য করতে হয়, কারও মনে কষ্ট দেওয়া যায় না, নিজের আগে অন্যের কথা ভাবতে হয়। কথাগুলো নিঃসন্দেহে সুন্দর। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন ভালো মানুষ হওয়ার অর্থ দাঁড়ায় সবসময় নিজের প্রয়োজনকে শেষের সারিতে রাখা। তখন সাহায্য আর আত্মত্যাগের মধ্যে সীমারেখাটা ধীরে ধীরে মুছে যায়। মানুষ অন্যের মুখের হাসি বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে নিজের ভেতরের ক্লান্তিটাকে আর দেখতে পায় না।

সব অনুরোধে সাড়া দেওয়া ভালোত্বের প্রমাণ নয়। কারণ মানুষের সময় সীমিত, শক্তি সীমিত, মনও সীমিত। প্রতিটি সম্পর্কের জন্য সবসময় উপস্থিত থাকা সম্ভব নয়। কখনও নিজের কাজের জন্য ‘না’ বলতে হয়, কখনও বিশ্রামের জন্য, কখনও শুধু নিজের শান্তির জন্য। অথচ ‘না’ বললেই মনে হয়—তবে কি স্বার্থপর হয়ে গেলাম? এই অপরাধবোধটাই অনেক মানুষকে এমন সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য করে, যেগুলো আসলে তাদের ছিল না।

ভালো মানুষ আর সবকিছু সহ্য করে যাওয়া মানুষ এক নয়। ভালো মানুষ অন্যের কষ্ট বোঝেন, কিন্তু নিজের কষ্টকে অস্বীকার করেন না। তিনি সাহায্য করেন, কিন্তু নিজের সীমাটুকুও বোঝেন। কাউকে ভালোবাসেন, কিন্তু সেই ভালোবাসার বিনিময়ে নিজের আত্মসম্মান বন্ধক রাখেন না। প্রয়োজন হলে পাশে দাঁড়ান, আবার প্রয়োজন হলে সরে দাঁড়াতেও জানেন। কারণ নিজের প্রতি অন্যায় করে অন্যের প্রতি ন্যায় করা যায় না।

অনেক সম্পর্কের মধ্যেই এই ভুলটা ধরা পড়ে দেরিতে। যে মানুষটি সবসময় সবার কাজ করে দেন, একসময় সবাই সেটাকেই তাঁর দায়িত্ব বলে ধরে নেন। তিনি একদিন ক্লান্ত হয়ে একটু পিছিয়ে গেলেই প্রশ্ন ওঠে—“এতদিন তো করতে, আজ পারছ না কেন?” তখন বোঝা যায়, ভালোবাসা আর অভ্যাসের মধ্যে কত সূক্ষ্ম পার্থক্য। কেউ আপনার সাহায্যকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করছে, নাকি আপনার নীরবতাকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে—এই পার্থক্যটুকু বোঝাও জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

নিজের জন্য সময় চাওয়া অপরাধ নয়। নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া স্বার্থপরতা নয়। কোনও সম্পর্ক থেকে সামান্য দূরত্ব নেওয়া মানেই সম্পর্ককে অস্বীকার করা নয়। বরং অনেক সময় একটু দূরে দাঁড়ালেই বোঝা যায়, কোন সম্পর্ক সত্যিই ভালোবাসার, আর কোন সম্পর্ক শুধু আপনার সবসময় available থাকার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা কখনও অন্যকে ছেড়ে দেওয়া নয়; কখনও সেটাই সম্পর্ককে সুস্থ রাখার একমাত্র উপায়।

জীবনের এক পর্যায়ে এসে মানুষ বুঝতে শেখে—সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। আপনি যতই ভালো থাকুন, কারও না কারও প্রত্যাশা পূরণ হবে না। আপনি যতই সাহায্য করুন, কেউ হয়তো আরও বেশি চাইবে। আপনি যতই চুপ থাকুন, কেউ সেটাকেও ভুল বুঝবে। তাই অন্যের প্রত্যাশার শেষ নেই; কিন্তু নিজের জীবনের সময়ের শেষ আছে। সেই সীমিত সময়ের মধ্যে নিজের শরীর, মন, স্বপ্ন, বিশ্রাম আর আত্মসম্মানের জন্যও কিছু জায়গা রাখা প্রয়োজন।

হয়তো সত্যিকারের ভালো মানুষ হওয়ার শুরু সেখানেই—যেদিন মানুষ অন্যের প্রয়োজন বুঝতে শেখার পাশাপাশি নিজের প্রয়োজনকেও অস্বীকার করা বন্ধ করে। সবসময় ‘হ্যাঁ’ বলা ভালোত্ব নয়; কখনও একটি শান্ত ‘না’ও আত্মসম্মানের ভাষা। কারণ যে মানুষ নিজের ভেতরটাকেই ধীরে ধীরে শূন্য করে ফেলেন, তিনি একসময় কাউকেই সত্যিকারের কিছু দিতে পারেন না। আর যে নিজের যত্ন নিতে শেখেন, তাঁর দেওয়া ভালোবাসা, সাহায্য ও উপস্থিতিরও তখন আলাদা মূল্য তৈরি হয়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা হয়তো এই নয়—“আমি সবার জন্য কতটা করতে পারলাম?” বরং আরও গভীর একটি প্রশ্ন—“অন্যের জন্য করতে করতে নিজের জন্য কতটুকু বেঁচে রইলাম?” এই প্রশ্নের উত্তর সবসময় সহজ হবে না। তবু উত্তরটা খোঁজা দরকার। কারণ ভালো মানুষ হওয়া সুন্দর, কিন্তু সেই ভালোত্বের ভেতর যদি নিজের অস্তিত্বটাই হারিয়ে যায়, তবে সেই ভালো থাকার অর্থ কোথাও গিয়ে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।


Comments

Popular posts from this blog

দাসত্ব

কলহ

দীনবন্ধু মিত্র