biswakorma
আদি ইঞ্জিনিয়ার কথন- বড়ো লেখা। ♥️
আজ ভাদ্র মাসের শেষ দিন, বিশ্বকর্মা পুজো। কিন্তু কে এই বিশ্বকর্মা? আজকের দিনে আমাদের চোখে বিশ্বকর্মা মানেই কারখানা, লোহার যন্ত্রপাতি, মেশিন, গ্যারেজ কিংবা দোকানের সরঞ্জাম। অথচ এই পরিচয় তাঁর প্রকৃত সত্তার একেবারেই সামান্য অংশ। বিশ্বকর্মা আসলে নির্মাণের মহাশক্তি—সৃষ্টি, পরিকল্পনা, পরিমাপ, স্থাপত্য, প্রযুক্তি ও রূপদানের যে চেতনা, তারই দেবতাত্মক প্রতীক। সেই অর্থে তিনি আমাদের আদি ইঞ্জিনিয়ার, আদি স্থপতি, আদি নির্মাতা। বিষ্ণুপুরাণ অনুসারে, অষ্টম বসু প্রভাসের ঔরসে এবং বৃহস্পতির ভগিনী যোগসিদ্ধার গর্ভে বিশ্বকর্মার জন্ম। তাঁকে সহস্র শিল্পের উদ্ভাবক, দেবতাদের স্থপতি, অলংকারনির্মাতা, শ্রেষ্ঠ শিল্পী এবং দেবতাদের রথের নির্মাতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বাংলার লোকবিশ্বাসে আবার তাঁর প্রাচীন নাম ত্বষ্টা ছিল—পরবর্তীকালে পিতামহ ব্রহ্মার দ্বারা ‘বিশ্বকর্মা’ উপাধিতে ভূষিত হন বলে একটি প্রচলিত কাহিনি রয়েছে। প্রাচীন বৈদিক পরম্পরায় ত্বষ্টা ও বিশ্বকর্মাকে অনেক সময় একই দেবশিল্পী-তত্ত্বের দুই নাম বা রূপ হিসেবে বোঝা হয়েছে; পরবর্তী পুরাণপরম্পরায় সেই ত্বষ্টাই আবার পৃথক সত্তা হয়ে বিশ্বকর্মার পিতৃরূপে আবির্ভূত হন। আর ত্বষ্টার সঙ্গে ইন্দ্রের বিরোধের কাহিনিও এই দেবশিল্পী-তত্ত্বকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। ত্বষ্টার পুত্র বিশ্বরূপকে ইন্দ্র বধ করলে ত্বষ্টা ক্রুদ্ধ হয়ে যজ্ঞের মাধ্যমে বৃত্রাসুরকে সৃষ্টি করেন, যে পরে ইন্দ্রের প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ এক প্রাচীন অভিন্ন দেবশিল্পী-তত্ত্বই কালক্রমে পুরাণের বিবর্তনে কখনও বিশ্বকর্মা, কখনও ত্বষ্টা, আবার কখনও পিতা-পুত্রের পৃথক পৌরাণিক রূপে প্রকাশিত হয়েছে। এই কারণেই বিশ্বকর্মা কোনও একক পৌরাণিক চরিত্রের সরল পরিচয় নন; তিনি বহু প্রাচীন দেবশিল্পী, সৃষ্টিশক্তি ও নির্মাণতত্ত্বের দীর্ঘ বিবর্তনের ফল।
বিশ্বকর্মার পারিবারিক পরম্পরাও কম বিস্ময়কর নয়। বিভিন্ন পুরাণ ও আঞ্চলিক পরম্পরায় তাঁর সন্তানদের নিয়ে নানা কাহিনি প্রচলিত। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের পরম্পরায় দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা ও স্বর্গের অপ্সরা ঘৃতাচীর নয় পুত্রের কথা বলা হয়—মালাকার, কর্মকার, কাংস্যকার, শঙ্খকার, সূত্রধর, কুবিন্দক, কুম্ভকার, স্বর্ণকার ও চিত্রকর। এঁদের প্রত্যেককে মর্ত্যলোকে একটি করে শিল্পপরম্পরা বা পেশার আদি পুরুষ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। মালাকার পুষ্প ও মালা শিল্পের, কর্মকার লৌহ বা কামার শিল্পের, কাংস্যকার কাঁসা ও ধাতুশিল্পের, শঙ্খকার শাঁখা ও শঙ্খশিল্পের, সূত্রধর কাঠের কাজ ও ছুতোরশিল্পের, কুবিন্দক বয়ন বা তাঁতশিল্পের, কুম্ভকার মৃৎশিল্পের, স্বর্ণকার সোনার গয়না ও অলঙ্কারশিল্পের এবং চিত্রকর অঙ্কন ও চিত্রশিল্পের আদিপুরুষ। অর্থাৎ বিশ্বকর্মার বংশকথা শুধু দেবলোকের কাহিনি নয়—তার মধ্যে ভারতীয় সমাজের বহুবিধ কারুশিল্প, হাতের কাজ এবং জীবিকার এক পৌরাণিক বংশপরম্পরাও যেন প্রতিফলিত হয়েছে। ফুলের মালা থেকে লোহার যন্ত্র, কাঁসার বাসন থেকে শাঁখা, কাঠের কাজ থেকে তাঁত, মাটির পাত্র থেকে স্বর্ণালঙ্কার এবং চিত্রাঙ্কন পর্যন্ত মানুষের সৃজনশীল শ্রমের এক বিশাল জগৎকে বিশ্বকর্মার সন্তানপরম্পরার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অন্য কিছু পরম্পরায় আবার মনু, ময়, ত্বষ্টা, শিল্পী ও দৈবজ্ঞ—এই পাঁচ পুত্রের কথাও পাওয়া যায়। ফলে বিশ্বকর্মার সন্তানদের তালিকা সব পুরাণে এক নয়; বরং বিভিন্ন সময় ও অঞ্চলের শিল্প-পরম্পরা তাঁর বংশকথার মধ্যে নিজেদের স্থান করে নিয়েছে। বিশেষত নলকে বাল্মীকি রামায়ণে সরাসরি বিশ্বকর্মার পুত্র বলা হয়েছে এবং সমুদ্রের উপর রামের সেতু নির্মাণের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত। পরবর্তী রামায়ণ-পরম্পরায় নল ও নীল—দুই ভাইয়ের নামই সেতুবন্ধনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যায়।
বাংলার প্রচলিত বিশ্বাসে আবার তাঁর কন্যাদের মধ্যেও এক বিস্ময়কর পৌরাণিক জগৎ বিস্তৃত—জ্যেষ্ঠা সংজ্ঞা বা সঞ্জনা, যিনি সূর্যপত্নী এবং যম ও যমুনার জননী; মধ্যমা বহিষ্মতী, যাঁর বিবাহ হয় স্বায়ম্ভুব মনুর পুত্র মহারাজা প্রিয়ব্রতের সঙ্গে; এবং কনিষ্ঠা চিত্রাঙ্গদা। বহিষ্মতীর ক্ষেত্রে শ্রীমদ্ভাগবত বিশ্বকর্মার কন্যা হিসেবে তাঁর পরিচয় দেয়। চিত্রাঙ্গদার পরিচয়টি অবশ্য মূলত পরবর্তী লোকপ্রচলিত; তাঁকে কোনওভাবেই মণিপুরের চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা চলে না। আর এই বংশপরম্পরার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেন ছায়া। বিষ্ণুপুরাণের বিখ্যাত কাহিনিতে তিনি সংজ্ঞারই ছায়ারূপ—সংজ্ঞা সূর্যের অসহ্য তেজ সহ্য করতে না পেরে নিজের ছায়াকে তাঁর কাছে রেখে চলে যান। সেই ছায়ার গর্ভে জন্ম নেন সাবর্ণি মনু, শনৈশ্চর বা শনি, এবং তপতী বা তাপতী। তপতী পরবর্তীকালে রাজা সম্বরণের পত্নী হন এবং তাঁদের পুত্র কুরু থেকেই কুরু-বংশের সূত্রপাত—তাই তপতীকে কুরু-বংশের জননী বলা হয়। এইভাবে বিশ্বকর্মার বংশকথা এসে মিশে যায় সূর্য, শনি, তপতী এবং ভারতীয় মহাকাব্যের কুরু-বংশের ইতিহাসের সঙ্গে।
বিশ্বকর্মার মূর্তিতত্ত্বও একরৈখিক নয়। বেশ কিছু পরম্পরায় তাঁকে ব্রহ্মা-স্বরূপেও কল্পনা করা হয়েছে—শুভ্র দাড়ি, হাতে বেদ ও কমণ্ডলু, এবং হংসবাহন; যেন ব্রহ্মারই আর এক নির্মাণময় প্রকাশ। এই রূপে বিশ্বকর্মার মধ্যে সৃষ্টির জ্ঞান, বেদ, পরিকল্পনা ও আদিসৃষ্টির তত্ত্বটি বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। অবাঙালি হিন্দুসমাজের বেশ কিছু অঞ্চলে এই ধরনের ব্রহ্মা-স্বরূপ বিশ্বকর্মার উপাসনার প্রচলন তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। বাংলায় অবশ্য বিশ্বকর্মার যে রূপটি সবচেয়ে পরিচিত ও বহুলপূজিত, তা হল যৌবনময়, বাদামী হস্তিবাহন বিশ্বকর্মা—যাঁকে বিষ্ণুস্বরূপ হিসেবে ভাবা হয়। হাতি এখানে নিছক বাহন নয়—শক্তি, স্থৈর্য, ধৈর্য, স্মৃতি ও ভার বহনের প্রতীক। আর পঞ্চমুখী, দশভুজ বিশ্বকর্মার যে শিবস্বরূপ রূপটি বিভিন্ন ধ্যানমন্ত্র ও পরম্পরায় বর্ণিত, বাংলার ধর্মজীবনে সেই তত্ত্ব অনেকাংশে মহাদেবের মধ্যেই যেন বিলীন হয়ে আছে—বিশ্বকর্মার পৃথক পূজার চেয়ে শিবতত্ত্বের মধ্যেই তার উপস্থিতি বেশি অনুভূত হয়। ফলে ব্রহ্মা-স্বরূপ, বিষ্ণু-স্বরূপ ও শিব-স্বরূপ—এই বিভিন্ন রূপের মধ্যে বিশ্বকর্মাকে এক ত্রিদেবসংযুক্ত দেবশিল্পী-তত্ত্ব হিসেবে দেখা যায়। কোথাও তিনি সৃষ্টির জ্ঞান, কোথাও পালন ও স্থিতির শক্তি, কোথাও রূপান্তর ও সংহারের নির্মাণশক্তি। তাই তাঁকে শুধু ‘মেশিনের দেবতা’ বলা তাঁর বিশাল ধর্মতাত্ত্বিক পরিসরকে ছোট করে ফেলা।
আর এই আদি নির্মাতার হাতের কাজের তালিকা যেন সমগ্র পুরাণজগতের এক মহাকাব্যিক স্থাপত্য। দেবতাদের অস্ত্র নির্মাণের সঙ্গে তাঁর নাম গভীরভাবে জড়িত—নারায়ণের সুদর্শনচক্র, মহাদেবের ত্রিশূল, কার্তিকেয়ের শক্তি, ইন্দ্রের বজ্র এবং অন্যান্য দিব্যাস্ত্রের নির্মাণের কাহিনি বিভিন্ন পুরাণপরম্পরায় পাওয়া যায়। মহিষাসুর বধের সময় দেবী দুর্গাকে বিশ্বকর্মা অভেদ্য বর্ম এবং সুতীক্ষ্ণ কুঠার দান করেছিলেন বলেও দেবীমাহাত্ম্য-পরবর্তী পুরাণ ও লোকপরম্পরায় কাহিনি প্রচলিত। সূর্যের অতিরিক্ত তেজ বিশ্বকর্মা ঘষে কমিয়ে দিয়েছিলেন; সেই অপসারিত তেজের অংশ থেকেই বিভিন্ন দেবাস্ত্র নির্মিত হয়েছিল বলে বিষ্ণুপুরাণে বর্ণিত। কুবেরের পুষ্পকরথ, স্বর্ণলঙ্কা—এইসব ঐশ্বরিক নির্মাণের সঙ্গেও পরবর্তী পুরাণ ও লোকপরম্পরায় তাঁর নাম জড়িয়ে আছে। পুরীর শ্রীক্ষেত্রে জগন্নাথদেবের শ্রীবিগ্রহ নির্মাণের সঙ্গেও বিশ্বকর্মার নাম প্রথিত; জগন্নাথ-বিগ্রহের নির্মাণকাহিনির নিজস্ব আঞ্চলিক ও পুরাণভিত্তিক রূপ থাকলেও দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার সঙ্গে তার সম্পর্ক পূর্বভারতীয় লোকস্মৃতিতে গভীর। আর বাংলার মঙ্গলকাব্যের জগতে তিনি আবার ফিরে আসেন বেহুলা-লখিন্দরের লৌহবাসরঘরের নির্মাতা হিসেবে। অর্থাৎ দেবতাদের সুদর্শনচক্র থেকে ইন্দ্রের বজ্র, দেবী দুর্গার অভেদ্য বর্ম ও সুতীক্ষ্ণ খড়্গ থেকে কুবেরের পুষ্পকরথ, স্বর্ণলঙ্কা থেকে জগন্নাথের শ্রীবিগ্রহ, আর বেহুলার লৌহবাসর—ভারতীয় পুরাণ ও লোকস্মৃতির বিচিত্র নির্মাণকল্পে বিশ্বকর্মার ছায়া বারবার ফিরে এসেছে। তাঁর কন্যা সংজ্ঞার উপাখ্যানেও আমরা দেখি এই নির্মাণশক্তির আর এক রূপ—সূর্যের অসহ্য তেজকে পরিমিত করে সেই অতিরিক্ত শক্তিকেই দেবাস্ত্রে রূপান্তরিত করা। অর্থাৎ বিশ্বকর্মার প্রকৃত কাজ শুধু সৃষ্টি করা নয়; শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে কার্যকর করে তোলাও তাঁর নির্মাণতত্ত্বের অংশ।
আর বিশ্বকর্মা পুজোর দিন আকাশে ঘুড়ি ওড়ার দৃশ্যটিও যেন এই দেবশিল্পীর সঙ্গে বাংলার নিজস্ব এক নীরব কথোপকথন। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশ্বকর্মা-পূজার তিথি এক নয়—কোথাও মকর সংক্রান্তি বা পৌষ সংক্রান্তির সঙ্গে তাঁর আরাধনা যুক্ত, কোথাও আবার আয়ুধপূজার মতো আঞ্চলিক পরম্পরায় তাঁর স্মরণ দেখা যায়। কিন্তু বাংলা ও পূর্বভারতের লোকায়ত পরম্পরায় ভাদ্র সংক্রান্তিই বিশ্বকর্মা পুজোর প্রধান দিন। কেন এই ভাদ্রের শেষ দিন? এর উত্তর একমাত্র কোনও একটি পুরাণকাহিনিতে খুঁজলে পাওয়া যায় না; বরং কৃষি, ঋতুচক্র, সূর্যের গতি এবং পূর্বভারতের আঞ্চলিক লোকাচারের দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্যেই এর ব্যাখ্যা খুঁজতে হয়। ভাদ্র সংক্রান্তি বর্ষার অন্তিম পর্ব ও শরতের আগমনের সন্ধিক্ষণ—আকাশ ধীরে ধীরে মেঘমুক্ত হতে শুরু করে, বাতাসে বদল আসে, আর প্রকৃতি যেন বর্ষার ভার ঝেড়ে নতুন ঋতুর দিকে এগিয়ে যায়। তাই এই সময়ে ‘নির্মাণ’-এর দেবতার আরাধনা যেন পুরনো জড়তা সরিয়ে নতুন কর্মচক্রের আহ্বান। বাংলার মানুষ সেই আহ্বানকে আবার আকাশের দিকে পাঠায় ঘুড়ির সুতোয়। ঘুড়ি মাটির মানুষকে আকাশের সঙ্গে এক মুহূর্তের জন্য জুড়ে দেয়—তার সুতো মানুষের হাতে, অথচ তার দৃষ্টি আকাশের দিকে। আধ্যাত্মিক অর্থে তাই ঘুড়ি হতে পারে মানুষের সীমাবদ্ধ দেহ ও অসীম আকাঙ্ক্ষার প্রতীক; সুতোটি যেন নিয়ম, সংযম ও কর্মের বন্ধন, আর আকাশ সেই অসীম বিশ্ব—যার দিকে মানুষ নিজের সৃষ্টিশক্তি, স্বপ্ন ও চেতনাকে উড়িয়ে দিতে চায়। সুতো ছিঁড়ে গেলে ঘুড়ি যেমন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে হারিয়ে যায়, তেমনই জীবনে কল্পনা ও শক্তির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্যও জরুরি। বিশ্বকর্মার দিনে তাই আকাশে উড়তে থাকা ঘুড়ি যেন বলে—মানুষের হাত মাটিতে থাকুক, কিন্তু তার স্বপ্নের আকাশ যেন সীমাহীন হয়।
কিন্তু বিশ্বকর্মাকে ঘিরে বাংলার সবচেয়ে আবেগের স্মৃতি হয়তো তাঁর পূজাকে ঘিরে। ছোটবেলায় বাবার মুখে শুনেছি—হাওড়া, হুগলি, দুর্গাপুর, রানিগঞ্জ কিংবা বাংলার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিশ্বকর্মা পুজো একসময় যেন আর একটি বড় উৎসব ছিল। কোথাও দু-তিন দিন ধরে চলত আনন্দ, মণ্ডপ, আলোকসজ্জা, প্রতিমা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মানুষ নতুন জামাকাপড় কিনত, সেই পোশাক পরেই বিশ্বকর্মা পুজো দেখতে বেরোত। কারখানা, ওয়ার্কশপ, লেদ-মেশিন, গ্যারেজ, ছাপাখানা, লোহার দোকান—যে সমস্ত জায়গায় মানুষের হাত ও যন্ত্র একসঙ্গে কাজ করত, সেখানে দেবশিল্পীর আরাধনা ছিল কর্মজীবনেরই এক উৎসব। একসময় যে বাংলার শিল্পাঞ্চলে বিশ্বকর্মার আগমন মানেই ছিল উৎসবের ঢেউ, আজ সেই স্মৃতির অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। তাই কখনও কখনও মনে হয়—বাংলার দুর্ভাগ্য, শিল্পহীন রাজ্যে দেবশিল্পীর আগমন ঘটে! ভাদ্র সংক্রান্তির বিশ্বকর্মা পুজো পূর্বভারত, বিশেষত বাংলার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এক লোকায়ত উৎসব। ভারতের অন্যত্র আবার বিশ্বকর্মা-উপাসনার সঙ্গে মকর সংক্রান্তি, পৌষ সংক্রান্তি বা আয়ুধপূজার মতো ভিন্ন তিথি ও আঞ্চলিক রীতির সম্পর্ক দেখা যায়। এই তিথিভেদের মধ্যেই ভারতীয় লোকধর্মের আঞ্চলিক বৈচিত্র্য ধরা পড়ে। বাংলায় আবার এই পুজোর সঙ্গে ঘুড়ি ওড়ানোর যে সম্পর্ক, তা এক স্বতন্ত্র লোকসংস্কৃতি। আর এই উৎসবের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি হল—এটি শুধু বড় শিল্পপতি বা বড় কারখানার উৎসব নয়; এটি খেটে-খাওয়া মানুষেরও উৎসব। রিকশাচালক, অটোওয়ালা, নটোওয়ালা, দর্জি, মুচি, কামার, ছোট দোকানের কারিগর, কারখানার শ্রমিক—সারাবছর যাঁরা নিজেদের শ্রম দিয়ে অন্যের জীবনকে একটু সহজ করে তোলেন, তাঁদের কাছেও এই একটি দিন যেন নিজের জন্য। দুর্গাপুজোর মণ্ডপ হয়তো তাঁরাই তৈরি করেন, কারও জামাকাপড় তাঁরাই সেলাই করেন, কারও বাড়ির লোহার গ্রিল তাঁরাই বানান, রিকশায় মানুষকে পুজো দেখতে পৌঁছে দেন—কিন্তু সেই উৎসবের কেন্দ্রে তাঁদের নিজেদের উপস্থিতি কতটা? বিশ্বকর্মা পুজোর দিন অন্তত সেই শ্রমজীবী মানুষটিই যেন উৎসবের কেন্দ্র হয়ে ওঠেন। আনন্দের নামে মদ্যপ অবস্থায় অভব্যতা, অশান্তি বা অন্যকে বিরক্ত করা অবশ্যই সমর্থনযোগ্য নয়; কিন্তু সেই বিচ্ছিন্ন অসংযমের জন্য খেটে-খাওয়া মানুষের আনন্দটুকুকেও খারাপ চোখে দেখতে আমার ভালো লাগে না।
তাঁর প্রচলিত ধ্যানমন্ত্রে বলা হয়—“বিশ্বকৃৎ, বিশ্বধৃক্।” যিনি বিশ্বকে নির্মাণ করেন, তিনিই আবার বিশ্বকে ধারণ করেন। আজও গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে তাই রয়ে গেছে সেই পৌরাণিকতা, লোকবিশ্বাস আর প্রচলিত গল্পকাহিনির অবশেষ। এখন হয়তো বাঙালি আর সেভাবে চর্চা করে না—কে ছিলেন বিশ্বকর্মার পিতা-মাতা, তাঁর সন্তান কারা, ত্বষ্টা কীভাবে কখনও তাঁর সঙ্গে অভিন্ন দেবশিল্পী, আবার কখনও তাঁর পিতৃরূপে প্রকাশিত হলেন, ইন্দ্রের সঙ্গে ত্বষ্টার সেই বিরোধ কীভাবে বিশ্বরূপ ও বৃত্রাসুরের কাহিনির জন্ম দিল, নয় পুত্রের মাধ্যমে মালাকার থেকে কর্মকার, সূত্রধর থেকে কুম্ভকার, স্বর্ণকার থেকে চিত্রকর—কীভাবে মানুষের বিচিত্র শিল্পপরম্পরা তাঁর বংশকথায় স্থান পেল, নল-নীলের মতো নির্মাণশক্তির উত্তরাধিকার কোথায় গিয়ে মিশল, সংজ্ঞা ও বহিষ্মতীর মতো কন্যারা কীভাবে সূর্য ও রাজবংশের সঙ্গে যুক্ত হলেন, ছায়ার সন্তান শনি ও তপতী কীভাবে সেই বংশকথাকে বহন করলেন—এসব প্রশ্ন আজ অনেকটাই বিস্মৃত। কিন্তু ইতিহাস তো বিস্মৃত হয় না; সে ফিরে ফিরে আসে তার প্রাচীনত্বের পসরা সাজিয়ে। বিশ্বকর্মা তাই শুধু পুরাণের স্বর্ণলঙ্কার নির্মাতা নন, শুধু সুদর্শনচক্র, ত্রিশূল, বজ্র বা পুষ্পকরথের নির্মাতা নন; তিনি জগন্নাথের শ্রীবিগ্রহের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দেবশিল্পী, বেহুলা-লখিন্দরের লৌহবাসরের লোকস্মৃতির নির্মাতা, রামসেতুর সঙ্গে যুক্ত এক মহাকাব্যিক কারিগর এবং সর্বোপরি মানুষের হাতের দক্ষতা, মস্তিষ্কের কল্পনা ও শ্রমের মর্যাদার প্রতীক। যে শ্রমিক অন্যের জন্য দুর্গাপুজোর মণ্ডপ বানায়, যে দর্জি অন্যের পুজোর জামা সেলাই করে, যে কারিগর অন্যের ঘর সাজায়, যে রিকশাচালক অন্যের উৎসবের যাতায়াত সহজ করে—বিশ্বকর্মার দিনে সেই মানুষটিই হয়ে ওঠেন নিজের উৎসবের কেন্দ্র। সারাবছর আমরা অন্যের পৃথিবী গড়ে দিই, অন্যের জীবনকে একটু সহজ করি; অন্তত একটি দিন যেন মনে হয়—আজকের দিনটা একটু আমাদেরও। তাই ভাদ্র সংক্রান্তির এই পুণ্যদিনে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার চরণে প্রণাম; প্রণাম সেই সমস্ত শ্রমজীবী হাতকেও, যাদের দক্ষতা, ঘাম আর পরিশ্রমে আমাদের পৃথিবী প্রতিদিন একটু একটু করে নির্মিত হয়।
Comments
Post a Comment