বিশ্বকর্মা

দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার পরম রূপবতী কন্যার নাম ছিল সংজ্ঞা। কোনো কোনো পুরাণে তাঁকে ‘সমজ্ঞা’ বা ‘সন্ধ্যা’ নামেও উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বকর্মা তাঁর কন্যার বিবাহ দেন নবগ্রহের অধিপতি সূর্যদেবের সঙ্গে।

কিন্তু তখন সূর্যদেব ছিলেন তাঁর পূর্ণ তেজে ভাস্বর। তাঁর শরীর থেকে নির্গত উত্তাপ ও আলোকরশ্মি ছিল এতটাই প্রবল যে, তাঁর দিকে সরাসরি তাকানোও প্রায় অসম্ভব ছিল। বিয়ের পর স্বামীর গৃহে এসে সংজ্ঞা সেই অসহনীয় তেজের মুখোমুখি হলেন। স্বামীকে ভালোবাসলেও তাঁর উত্তাপ ক্রমশ সংজ্ঞার শরীর ও মনকে ক্লান্ত করে তুলতে লাগল। শেষ পর্যন্ত এমন দিন এল, যখন সূর্যদেবের দিকে সরাসরি তাকানোও তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না।

কিন্তু স্বামীকে ছেড়ে চলে যেতেও তাঁর মন সায় দিচ্ছিল না। তাই সংজ্ঞা এক আশ্চর্য উপায় অবলম্বন করলেন।
নিজের শরীর থেকেই তিনি সৃষ্টি করলেন নিজের অবিকল এক ছায়া-রূপ।

তার নাম দিলেন—ছায়া।

সংজ্ঞা ছায়াকে নির্দেশ দিলেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে যেন সে সূর্যদেবের সেবা করে, তাঁর গৃহ সামলায় এবং সবচেয়ে বড় কথা—নিজের আসল পরিচয় যেন কোনোভাবেই প্রকাশ না করে।

এরপর সংজ্ঞা চলে গেলেন দূর উত্তর কুরু দেশে। কিন্তু সেখানেও নিজের পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার ভয় ছিল। তাই তিনি ধারণ করলেন ঘোটকীর—অর্থাৎ স্ত্রী-ঘোড়ার—রূপ এবং সেখানে তপস্যা শুরু করলেন।

এদিকে সূর্যদেব বুঝতেই পারলেন না যে তাঁর পাশে আর সংজ্ঞা নেই। তাঁর জায়গায় রয়েছেন তাঁরই ছায়া।
দীর্ঘদিন এই রহস্য গোপনই রইল। ছায়ার গর্ভে সূর্যদেবের সন্তানও জন্ম নিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন শনি দেব, যিনি ন্যায় ও কর্মফলের বিচারক হিসেবে পরিচিত, এবং যমুনা নদী। অন্যদিকে সংজ্ঞার পূর্বের সন্তানদের মধ্যে ছিলেন যমরাজ।

কিন্তু একদিন এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা এই গোপন রহস্যের দরজা খুলে দিল।

কোনো একটি ভুলের জন্য ছায়া তাঁর সৎপুত্র যমরাজকে অভিশাপ দিয়ে বসলেন। ঘটনাটি সূর্যদেবের মনে গভীর সন্দেহের জন্ম দিল। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল—একজন মা কি নিজের সন্তানকে এমন ভয়ঙ্কর অভিশাপ দিতে পারেন?
সূর্যদেব তখন তাঁর দিব্যদৃষ্টি প্রয়োগ করলেন। ছায়ার কাছ থেকেও সত্য জানতে চাইলেন। শেষ পর্যন্ত প্রকাশ পেল সেই গোপন সত্য—যাঁকে এতদিন তিনি সংজ্ঞা ভেবে পাশে রেখেছিলেন, তিনি আসলে সংজ্ঞা নন। সংজ্ঞা তাঁকে ছেড়ে বহু দূরে চলে গেছেন।

বিরহে ব্যাকুল সূর্যদেব এবার শ্বশুর বিশ্বকর্মার কাছে গেলেন। বিশ্বকর্মা তাঁকে সব কথা জানিয়ে বললেন, সংজ্ঞা তাঁকে ঘৃণা করে চলে যাননি। তাঁর অসহ্য তেজ ও উত্তাপই সংজ্ঞাকে দূরে সরে যেতে বাধ্য করেছে।

তারপর বিশ্বকর্মা সূর্যদেবের কাছে এক অদ্ভুত প্রস্তাব রাখলেন।
তিনি বললেন, যদি সূর্যদেব অনুমতি দেন, তবে তাঁর অতিরিক্ত তেজের কিছুটা কমিয়ে দেওয়া সম্ভব। তাহলে হয়তো সংজ্ঞা আবার তাঁর কাছে ফিরে আসতে পারবেন।
স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার জন্য সূর্যদেব নিজের অহংকার ও তেজের একটি অংশ বিসর্জন দিতে রাজি হলেন।

তখন শুরু হল এক অভূতপূর্ব দেবকার্য।

বিশ্বকর্মা তাঁর অলৌকিক কারিগরি বিদ্যার সাহায্যে সূর্যদেবকে একটি মহাজাগতিক ঘূর্ণায়মান চক্র বা ‘Celestial Lathe’—এক ধরনের স্বর্গীয় লেদ মেশিনে স্থাপন করলেন। তারপর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সূর্যদেবের অপরিমেয় তেজ থেকে আট ভাগের এক ভাগ—১/৮ অংশ—কেটে ছেঁটে বাদ দিলেন।

সূর্যদেবের উত্তাপ কিছুটা সহনীয় হল। তাঁর তীব্র, চোখ-ধাঁধানো ঔজ্জ্বল্যও পেল এক নতুন রূপ—যেন সেই প্রখর দীপ্তির উপর এসে পড়ল এক কোমল ‘ম্যাট ফিনিশ’।
এরপর সূর্যদেবও ঘোড়ার রূপ ধারণ করে গেলেন সংজ্ঞার কাছে। আর সেখানেই ঘটল তাঁদের পুনর্মিলন।

কিন্তু এখানেই এই কাহিনির সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায় শুরু।

বিশ্বকর্মা সূর্যদেবের শরীর থেকে যে ১/৮ অংশ তেজ কেটে নিয়েছিলেন, তা কোনো সাধারণ আলো বা আগুন ছিল না। সেটি ছিল দেবতার শুদ্ধ তেজ—অপরিমেয় শক্তিতে পূর্ণ এক জ্বলন্ত সৌর ধূলিকণা। সেই তেজ মহাবিশ্বে ছড়িয়ে দিয়ে নষ্ট করা হল না।

দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা তাঁর অতুলনীয় কারিগরি বিদ্যা দিয়ে সেই জ্বলন্ত তেজকে কাজে লাগালেন। আর সেই তেজ থেকেই একে একে তৈরি হল দেবতাদের এমন কিছু অস্ত্র ও বাহন, যাদের নাম আজও ভারতীয় পুরাণের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকগুলোর মধ্যে উচ্চারিত হয়।

প্রথমেই তৈরি হল ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র—সূর্যের ঘূর্ণায়মান তেজ থেকে নির্মিত এক অসামান্য, নিখুঁত ও মহাশক্তিশালী চক্র। বিশ্বকর্মা সেটি ভগবান বিষ্ণুকে উপহার দেন।

এরপর সেই সৌর তেজের আরেক অংশ থেকে নির্মিত হল মহাদেব শিবের ত্রিশূল—যার শক্তির সামনে ত্রিভুবনও কেঁপে উঠতে পারে।

সেই তেজ থেকেই তৈরি হয়েছিল দেবসেনাপতি কার্তিক বা মুরুগানের মহাশক্তিশালী ‘ভেল’ বা বল্লম—যা তাঁর প্রধান অস্ত্র হিসেবে পরিচিত।

কিন্তু বিশ্বকর্মার সৃষ্টি সেখানেই থামেনি।

সূর্যের অবশিষ্ট জ্বলন্ত কণাগুলির সাহায্যে নির্মিত হল এক অপূর্ব আকাশযান—পুষ্পক বিমান। কথিত আছে, এই বিমান মনের গতিতে চলতে পারত। প্রথমে ব্রহ্মার মাধ্যমে এটি লাভ করেছিলেন ধনের দেবতা কুবের। পরে রাবণ কুবেরের কাছ থেকে সেই পুষ্পক বিমান কেড়ে নেয়।

আর সেই একই সৌর তেজের আরেক অংশ দিয়ে নির্মিত হয়েছিল যমদণ্ড—মৃত্যুর দেবতা যমরাজের কালদণ্ড।

অর্থাৎ, একজন স্ত্রীর অসহ্য যন্ত্রণা থেকে শুরু হওয়া এই কাহিনি শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়াল দেবতাদের মহাশক্তিশালী অস্ত্র ও বাহনের সৃষ্টিতে।

একদিকে সূর্যদেব হারালেন তাঁর অতিরিক্ত তেজের এক-অষ্টমাংশ; অন্যদিকে সেই বিসর্জিত তেজই বিশ্বকর্মার হাতে একে একে ধারণ করল নতুন নতুন রূপ—সুদর্শন চক্র, ত্রিশূল, কার্তিকের ভেল, পুষ্পক বিমান আর যমরাজের যমদণ্ড।

যে তেজ ছিল অসহনীয়, বিশ্বকর্মার শিল্পে সেই তেজই হয়ে উঠল সৃষ্টির শক্তি।�যে আগুনকে কমিয়ে আনতে হয়েছিল, বিশ্বকর্মার কারিগরি বিদ্যাই সেই আগুনকে পরিণত করল দেবতাদের অস্ত্রে।

পুরাণের এই কাহিনি যেন তাই মনে করিয়ে দেয়—সৃষ্টি শুধু কিছু বানিয়ে দেওয়ার নাম নয়; ধ্বংসের সম্ভাবনাকে সরিয়ে, অপ্রয়োজনীয়কে ছেঁটে, অসীম শক্তিকে সঠিক রূপ দেওয়াও এক মহান শিল্প।

আর সেই শিল্পের অধিপতি—দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা।

যাঁর হাতে দেবতাদের অস্ত্র পেয়েছে রূপ, যাঁর কারিগরি বিদ্যায় মহাজাগতিক শক্তি পেয়েছে ব্যবহারযোগ্য অবয়ব, সেই বিশ্বকর্মাকেই প্রণাম জানিয়ে আজকের এই কাহিনি।

Comments

Popular posts from this blog

দাসত্ব

কলহ

দীনবন্ধু মিত্র