মহাবলী
কেটে গেছে বহুদিন মৃত হিরণ্যকশিপু
অসুরকুলের ইতি, থামেনি তখনো।
নরসিংহের হাতে হিরণ্যকশিপুর বধের পর তাঁর পুত্র প্রহ্লাদ রাজ্যভার গ্রহণ করেন। ভক্তির যে বীজ প্রহ্লাদের হৃদয়ে ছিল, তারই উত্তরাধিকার বহন করেছিলেন তাঁর পুত্র বিরোচন এবং বিরোচনের পুত্র মহাবলী। বিরোচনের দানের খ্যাতিও কম ছিল না—এক পুরাণকথায় আছে, ইন্দ্র বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের বেশে তাঁর কাছে এসে তাঁর মস্তকই দান হিসেবে চেয়েছিলেন, আর বিরোচন বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে নিজের মাথা দান করেছিলেন। সেই বংশেই জন্ম নিলেন মহাবলী। শুক্রাচার্যের নির্দেশে মহাবলী বিরাট যজ্ঞ সম্পন্ন করলে যজ্ঞাগ্নি থেকে তাঁর জন্য আবির্ভূত হয় দিব্য রথ, অশ্ব, ধনু ও অস্ত্র; প্রহ্লাদ তাঁকে দেন অবিনশ্বর মালা, আর শুক্রাচার্য দেন শঙ্খ। সেই শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে মহাবলী দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল—তিন ভুবনের অধিপতি হয়ে উঠলেন। ইন্দ্র সিংহাসনচ্যুত হলেন, আর দেবতারা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে পালিয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে দিন কাটাতে লাগলেন।
দেবতাদের এই দুর্দশা দেখে দেবমাতা অদিতির হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে গেল। তিনি স্বামী কশ্যপের শরণ নিলে কশ্যপ তাঁকে নারায়ণের আরাধনা এবং পয়োব্রত পালনের নির্দেশ দিলেন। অদিতির তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে স্বয়ং নারায়ণ প্রতিশ্রুতি দিলেন—তিনি অদিতির গর্ভে জন্ম নিয়ে দেবতাদের অধিকার ফিরিয়ে দেবেন। তারপর একদিন অদিতির গর্ভ থেকে আবির্ভূত হলেন ক্ষুদ্রকায় এক ব্রহ্মচারী—হাতে দণ্ড, কমণ্ডলু, মাথায় ছাতা, কোমরে মেখলা। তাঁর দেহ ছিল ছোট্ট, অথচ সেই ক্ষুদ্র দেহের মধ্যেও যেন মহাবিশ্বের এক অদৃশ্য ভার; সামান্য মেদ, কিঞ্চিৎ ভুঁড়ি যেন ইঙ্গিত দিচ্ছিল—এই ছোট্ট ব্রহ্মচারীর উদরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসংখ্য জগতের বিস্তার। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং নারায়ণ—বামন অবতার। ক্ষুদ্র দেহে তিনি তখন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, অথচ তাঁর পদতলের নিচেই অপেক্ষা করছে সমগ্র সৃষ্টির পরিমাপ।
সেই সময় মহাবলী বিরাট যজ্ঞে বসেছেন। দানের জন্য তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই যজ্ঞসভায় এসে দাঁড়ালেন বামন। মহাবলী তাঁকে প্রণাম করে বললেন, “হে ব্রাহ্মণ, কী চাই আপনার?” বামন শান্ত স্বরে বললেন—“আমি চাই ত্রিপাদ ভূমি”—মাত্র তিন পা পরিমাণ জমি। শুক্রাচার্য তখনই বুঝে ফেললেন, এই বালক কোনো সাধারণ ব্রাহ্মণ নন; তিনি স্বয়ং নারায়ণ। তিনি মহাবলীকে দান থেকে বিরত করলেন। কিন্তু মহাবলী বললেন, তাঁর পিতামহ প্রহ্লাদ ভগবানের ভক্ত ছিলেন, তাঁর পিতা বিরোচন নিজের মস্তক পর্যন্ত দান করেছিলেন—তিনি কী করে প্রতিশ্রুতি দিয়ে পিছিয়ে যাবেন? মহাবলী জল ঢেলে দান সম্পূর্ণ করতে গেলে শুক্রাচার্য ক্ষুদ্র কীটের রূপ নিয়ে কমণ্ডলুর মুখ বন্ধ করে দিলেন। বামন কুশের অগ্রভাগ দিয়ে সেই মুখ পরিষ্কার করতে গেলে কুশের অগ্রভাগ শুক্রাচার্যের চোখ বিদ্ধ করে; তাঁর এক চোখ নষ্ট হয়ে যায়, আর কমণ্ডলু থেকে জলধারা নেমে এসে দান সম্পূর্ণ হয়। তারপর সেই ক্ষুদ্র বামন মুহূর্তের মধ্যে হয়ে উঠলেন ত্রিবিক্রম। তাঁর প্রথম পদে মর্ত্যলোক পরিমাপ হল, আর দ্বিতীয় পদ উঠল আকাশ ভেদ করে স্বর্গলোকের দিকে।
সেই মহাপদ যখন ব্রহ্মলোকের সীমানা স্পর্শ করল, তখন ব্রহ্মা ভগবানের চরণে অর্ঘ্যজল নিবেদন করলেন। সেই চরণধৌত পবিত্র জলই দেবগঙ্গারূপে প্রবাহিত হতে লাগল—স্বর্গে যার ধারা মন্দাকিনী নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে ভগীরথের তপস্যায় সেই গঙ্গার মর্ত্যে অবতরণের সময় মহাদেব তাঁর জটাজালে তাঁকে ধারণ করলেন, যাতে তাঁর প্রবল স্রোতে পৃথিবী বিপর্যস্ত না হয়। শিবের জটাজাল থেকে মুক্ত হয়ে গঙ্গা ভগীরথকে অনুসরণ করে সাগরদ্বীপের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং কপিল মুনির আশ্রমের কাছে তাঁর পূর্বপুরুষ সগর রাজার পুত্রদের মুক্তি দিলেন। আর তখন ত্রিবিক্রম তৃতীয় পদ রাখার জন্য মহাবলির দিকে ফিরে তাকালেন—“এবার আমার তৃতীয় পদটি কোথায় রাখব?”
মহাবলী তখন মাথা নত করে বললেন—“প্রভু, আমার আর কিছু নেই; আমার মাথার উপরেই রাখুন আপনার তৃতীয় পদ।” নারায়ণের তৃতীয় পদ এসে পড়ল মহাবলির মস্তকে। মহাবলী রাজ্য হারালেন, ইন্দ্র ফিরে পেলেন স্বর্গের সিংহাসন; কিন্তু মহাবলী ধ্বংস হলেন না। নারায়ণ তাঁকে সুতলে স্থান দিলেন এবং নিজেই তাঁর দ্বাররক্ষক হয়ে থাকলেন। বাহ্যিক রাজ্য হারালেও মহাবলী যে জিনিসটি পেলেন, তা ছিল আরও গভীর—নিজের ‘আমি’-কে ভগবানের চরণে সমর্পণের শিক্ষা। প্রথম দুই পদে যেন নারায়ণ মেপে নিলেন মানুষের বাহ্যিক জগৎ ও আকাশ-স্বর্গের বিস্তার, আর তৃতীয় পদে চাইলেন অহংকারটুকু। সেই কারণেই মহাবলী কেবল অসুররাজ নন, তিনি দানের আদর্শ—বাংলার লোকমুখেও তাঁর নাম আজও ‘দানবীর বলি’ হিসেবে উচ্চারিত হয়; এমনকি লোকপ্রচলিত প্রবাদে শোনা যায়, “অতি দানে বলি বদ্ধ”—অর্থাৎ অতিরিক্ত দান কখনও কখনও দাতার নিজের সর্বস্বও কেড়ে নিতে পারে। আর পুরাণের ধারায় এরপর কালের চাকা এগিয়ে যায়; পরে পৃথিবীর রাজশক্তির মধ্যে যখন কিছু ক্ষত্রিয় রাজা ধর্মচ্যুত ও অত্যাচারী হয়ে ওঠেন, তখন নারায়ণ আবার আবির্ভূত হন পরশুরাম রূপে। তবে সে আর এক কাহিনি—বামনের ক্ষুদ্র পদ থেকে ত্রিবিক্রমের বিশ্বজয় পেরিয়ে পুরাণের সেই তত্ত্বপথ তখন এগিয়ে যায় আর-এক অবতারের দিকে।
শুভ বামন দ্বাদশী। 🤍
Comments
Post a Comment