রথ টানতে দুর্গা আসেন
—• রথ টানলে দুর্গা আসে •—
আষাঢ় মাসের শেষ নির্মল আলোক।
কৈলাস পর্বতে দেখি, অদ্ভুত ব্যস্ততা।
উৎসবের আয়োজনে, ব্যস্ত দেবলোক।
মর্ত্য থেকে ভেসে আসে আনন্দ বারতা।
রথের চাকা যে আজ গড়াবে এবার।
জগন্নাথ, বলরাম সুভদ্রা ভগিনী।
মর্ত্য অভিমুখে সবে হইবেন বার।
রথে চড়ে সেজেগুজে, কঙ্কন কিঙ্কিনী।
জানেন দেবতা সব, বুঝে বিচক্ষণ।
ভাইবোন নয় শুধু, মাতা
বাদ্য অলঙ্কার সহ, সুখ আস্বাদন।
দিব্য ভাব ললনায়,
অধরে অরুণ হাস, নয়নে প্রভাতী।
ভাবভরে মাতোয়ারা, কমল কানন।
হিমাদ্রী শিখর পরে, অপরূপ জ্যোতি।
কৈলাসের এক কোণে করে বিচরণ।
মা দুর্গা
তিন সন্তানকে নিয়ে আদরে ভরিয়ে দিচ্ছেন। সুভদ্রা আগের মতোই মায়ের কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে বসে আছে। কিন্তু জগন্নাথ আর বলরাম আজ যেন বড়ই দুষ্টুমি করছে। দু'জনে মায়ের আঁচল শক্ত করে ধরে লুকিয়ে আছে—যেন কেউ দেখতেই না পায়।
দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখে দেবাদিদেব মহাদেব মৃদু হেসে এগিয়ে এলেন, সহাস্যে বদনে বললেন,
"উমা, এখনও ওদের তৈরি করতে পারোনি!"
মা দুর্গা মুচকি হেসে বললেন,
"আমি তৈরি করব কী করে? দেখো না, দু'জন কেমন আঁচল ধরে লুকিয়ে আছে---মনে হচ্ছে আজ আর রথে উঠবেই না।"
মহাদেব একটু গম্ভীর হওয়ার ভান করে বললেন,
"সে কি! মর্ত্যের মানুষ যে অপেক্ষা করে বসে আছে। রথযাত্রা শুরু না হলে তোমার আগমনের দিনও তো গোনা শুরু হবে না।"
কথা শেষ হতেই আঁচলের আড়াল থেকে উঁকি দিল জগন্নাথ, চোখ দুটো গোল গোল করে বলল,
"আমরা জানি। কিন্তু মা'কে ছেড়ে যেতে মন চায় না আমাদের।"
বলরামও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
"তাছাড়া মা তো সুভদ্রাকে কোলে নিয়েছে, আমাদেরও কোলে নিতে হবে।"
সুভদ্রা খিলখিলিয়ে হেসে বলল,
"দেখলে মা! আমি তো কিছু বলিনি, ওরাই শুধু ছোট্ট বাচ্চা হয়ে গেছে!"
এবার জগন্নাথ অভিমানী গলায় বলে উঠল,
"মা, আমরা যাব না। তোমাকে ছেড়ে একটুও ভালো লাগে না।"
বলরামও মুচকি হেসে আরো বললশ্ব,
"যদি যেতেই হয়, তাহলে আগে কোলে নাও। সুভদ্রার মতো আজ আমরা ছোট্ট বাচ্চাই থাকব।"
মহাদেব সেই দৃশ্য দেখে মৃদু হেসে বললেন,
"উমা, দেখলে তো? জগৎ যাদের জগন্নাথ আর বলরাম বলে ডাকে, তাঁরা তোমার কাছে আজও ছোট্ট সন্তানই রয়ে গেছে।"
মা দুর্গার চোখে স্নেহের আলো ঝলমল করে উঠল।
"সন্তান কি কোনোদিন বড় হয় মহাদেব? মায়ের কোলেই তো তাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।"
এরপর তিনি মায়াভরা চোখে তাকিয়ে
জগন্নাথের মাথায় আলতো করে হাত রেখে বলে উঠলেন,
"তোমরা তো জগতের নাথ, শক্তির প্রতীক। এখনও এত আদর চাই?"
জগন্নাথ ঠোঁট ফুলিয়ে উত্তর দিল,
"জগতের কাছে আমরা বড় হতে পারি, কিন্তু মায়ের কাছে তো আমরা শুধু সন্তান।"
মহাদেব মৃদু হাসলেন কথাটা শুনে।
"এই কথার উত্তর তোমার কাছেও নেই উমা। সন্তানের কাছে মা যেমন আশ্রয়, তেমনি মায়ের কাছেও সন্তান সবসময় ছোটই থেকে যায়! "
মা দুর্গার চোখে তখন অপার মমতা।
তিনি এক হাতে সুভদ্রাকে বুকে আগলে রাখলেন, অন্য হাতে টেনে নিলেন জগন্নাথকে। তারপর বলরামও আর নিজেকে সামলাতে পারেনি না, সেও এসে মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়ালো।
তিনজন যেন একসঙ্গে মা'কে জড়িয়ে ধরল।
সেই দৃশ্য দেখে কৈলাসের বাতাসও যেন থমকে গেছে, দেবলোকের সকল দেবদেবী মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
মা দুর্গা তিন সন্তানের উদ্দেশ্যে বললেন,
"তোমরা জানো তো, মর্ত্যের মানুষ কত ভালোবাসা নিয়ে অপেক্ষা করে? রথের দড়িতে হাত রেখে তারা শুধু তোমাদেরই ডাকে না, সেই টানের মধ্যেই আমাকে ডেকে আনে। তোমরা না গেলে, আমার আগমনের পথই যে খুলবে না।"
বলরাম মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বলল,
"তাহলে তুমি আমাদের পেছন পেছনই আসবে তো?"
"অবশ্যই আসব। তোমাদের রথের চাকার দাগ ধরেই তো আমার পথ তৈরি হয়।"
জগন্নাথ দুষ্টুমি করে বলল,
"তা হলে একটা শর্ত আছে।"
"কী শর্ত?"
"আজ আমাদের তুমি নিজে রথে বসিয়ে দেবে।"
মা দুর্গা হেসে ইতিবাচক মাথা নাড়লেন, এমন আদুরে আবদার----
"এই তো! এতক্ষণে আসল কথা বেরোলো।"
মহাদেবও নিজেও হেসে ফেললেন,
"উমা, আজ ওদের আবদার মেনেই নাও। এই আবদারেই তো লুকিয়ে আছে মায়ের প্রতি সন্তানের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।"
মা দুর্গা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে ধীরে ধীরে রথের দিকে এগিয়ে গেলেন। প্রথমে কোলে থাকা সুভদ্রাকে আদর করে রথের মাঝখানে বসিয়ে দিলেন, তারপর বলরামের হাত ধরে উঠিয়ে দিলেন এক পাশে। শেষে জগন্নাথকে বসাতে গিয়েও তিনি দেখলেন—সে আবার আঁচল ধরে আছে।
"এই যে! এখনও ছাড়বে না?"
জগন্নাথ মিষ্টি হেসে বলল,
"যতক্ষণ না তুমি বলছ—'যাও বাবা', ততক্ষণ আমি কোথাও যাচ্ছি না।"
মা দুর্গা জগন্নাথের দুই গালে হাত রেখে স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,
"যাও বাবা... তোমাদের যাত্রাই তো আমার আগমনের বার্তা। তোমরা মানুষের হৃদয়ে ভরসা জাগিয়ে তোলো"।
জগন্নাথ এবার আঁচল ছেড়ে রথে গিয়ে বসল।
দেবলোকে শঙ্খধ্বনি বেজে উঠলো। রথের দড়িতে প্রথম টান পড়ল। চাকা ধীরে ধীরে গড়িয়ে চলল মর্ত্যের পথে।
মা দুর্গা স্থির দৃষ্টিতে সেই রথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর ঠোঁটে স্নিগ্ধ হাসি, চোখে সন্তানের জন্য আশীর্বাদ।
মহাদেব পাশে এসে দাঁড়িয়ে নরম স্বরে বললেন,
"উমা, এবার তোমারও প্রস্তুতি শুরু হোক। পৃথিবী তোমার অপেক্ষায় প্রহর গুনবে।"
মা দুর্গা সামনের বিস্তৃত মেঘমালার দিকে তাকিয়ে আছেন,
"হ্যাঁ মহাদেব। ওদের রথ যত এগোবে, আমি ততই কাছে পৌঁছে যাব মর্ত্যের মানুষের ভালোবাসার উঠোনে।"
যুগের পর যুগ বাঙালির বিশ্বাসে এক অপূর্ব অনুভূতি বেঁচে আছে। রথযাত্রা মানেই শুধু জগন্নাথদেবের উৎসব নয়— রথের চাকা যখন ঘুরতে শুরু করে, তখনই শরতের মৃদু হাওয়া অদৃশ্য ভাবে জানিয়ে দেয়—জগজ্জননী আসছেন!
তাই তো বলা হয়,
"রথের চাকা যখন গড়িয়ে চলে,
তখনই শুরু হয় মায়ের আগমনের প্রতীক্ষা।
তাই তো বাঙালি বলে—
রথ টানলে দুর্গা আসে..."।
Comments
Post a Comment