বারবারিক
মহাভারতের এক জীবন্ত চরিত্র "বারবারিক" কাহিনি- 💠
মহাভারতের এক অন্যতম শক্তিশালী এবং উপেক্ষিত চরিত্র হলেন বারবারিক। ভীমের পৌত্র এবং ঘটোৎকচের পুত্র বারবারিককে মহাভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধাদের মধ্যে একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও তিনি সরাসরি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশ নেননি, তবে তার কাহিনী যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
🌿🌿বারবারিকের পরিচয়🌿🌿
বারবারিক ছিলেন ঘটোৎকচ এবং মৌরবী বা আহিলাবতী'র পুত্র। শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত সাহসী এবং বীর যোদ্ধা ছিলেন। তিনি তার মায়ের কাছ থেকে যুদ্ধবিদ্যা শেখেন। তপস্যা করে শিবের কাছ থেকে তিনি তিনটি অমোঘ বাণ লাভ করেন। এই তিনটি বাণের সাহায্যে তিনি একাই যেকোনো যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারতেন। এই বাণগুলো এমন ছিল যে, প্রথম বাণ দিয়ে তিনি যাদের ধ্বংস করতে চান তাদের চিহ্নিত করতে পারতেন, দ্বিতীয় বাণ দিয়ে যাদের রক্ষা করতে চান তাদের চিহ্নিত করতেন, এবং তৃতীয় বাণটি দিয়ে চিহ্নিত করা সমস্ত শত্রুদের ধ্বংস করে আবার তার তূণীরে ফিরে আসতো।
🌿🌿কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে বারবারিক🌿🌿
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যখন অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন বারবারিক যুদ্ধ দেখতে আসেন। তার মা-কে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, যে পক্ষ দুর্বল হবে তিনি সেই পক্ষের হয়েই যুদ্ধ করবেন। তখন কৌরবদের তুলনায় পাণ্ডবদের সেনা কম থাকায়, বারবারিক পাণ্ডবদের পক্ষে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই কথা জানতে পেরে একজন সাধারণ ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে বারবারিকের কাছে যান এবং তার যুদ্ধ করার ক্ষমতা পরীক্ষা করেন। বারবারিক জানান যে, তিনি তার তিন বাণের সাহায্যে মাত্র এক মিনিটে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ করে দিতে পারেন।
শ্রীকৃষ্ণ বুঝতে পারেন যে, যদি বারবারিক যুদ্ধে অংশ নেন, তাহলে তিনি তার প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী প্রথমে কৌরবদের ধ্বংস করবেন, কিন্তু তাতে পাণ্ডবদের কিছু মহারথী যেমন ভীম, অর্জুন বেঁচে থাকবেন। তখন কৌরব পক্ষ দুর্বল হয়ে যাবে এবং বারবারিককে তার প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী পাণ্ডবদের ধ্বংস করতে হবে। এভাবে তিনি একাই উভয় পক্ষকে ধ্বংস করে দেবেন, যা হবে ধর্মের বিরুদ্ধে।
তাই শ্রীকৃষ্ণ বারবারিকের কাছে তার মস্তক দান হিসাবে চেয়ে বসেন। বারবারিক তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য সানন্দে নিজের মস্তক দান করেন। তবে তিনি শ্রীকৃষ্ণের কাছে একটি শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করেন যে তিনি সম্পূর্ণ যুদ্ধ দেখতে চান। শ্রীকৃষ্ণ তার এই ইচ্ছা পূরণ করেন এবং তার কাটা মস্তকটি একটি উঁচু পাহাড়ের উপরে স্থাপন করেন। এই মস্তক জীবিত অবস্থায় ১৮ দিনের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ পুরোপুরি দেখেছিলেন।
🌿🌿বারবারিকের পরবর্তী জীবন ও উপাসনা🌿🌿
যুদ্ধ শেষে পাণ্ডবরা যখন নিজেদের বীরত্ব নিয়ে গর্ব করছিলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাদের বারবারিকের কাছে পাঠান। বারবারিক তখন বলেন যে, তিনি যুদ্ধে শুধু শ্রীকৃষ্ণকেই দেখেছেন। তিনিই এক হাতে সমস্ত শত্রুদের বিনাশ করছিলেন এবং অন্য হাতে পাণ্ডবদের রক্ষা করছিলেন। বারবারিকের মতে, সব কিছুর মূলে ছিলেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ।
বারবারিকের আত্মত্যাগে মুগ্ধ হয়ে শ্রীকৃষ্ণ তাকে আশীর্বাদ দেন যে, কলিযুগে তিনি খাটু শ্যাম নামে পূজিত হবেন এবং তার নাম শ্রীকৃষ্ণের নামের সমতুল্য হবে। রাজস্থানে বারবারিকের মন্দির আছে এবং সেখানে তিনি খাটু শ্যাম হিসেবে পূজিত হন। গুজরাটে তিনি বলিয়াদেব নামেও পরিচিত।
বারবারিক হলেন সেই বীর, যিনি নিজের মহান আত্মত্যাগের মাধ্যমে ধর্ম প্রতিষ্ঠায় এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং এখনো পর্যন্ত জীবিত এক কিংবদন্তী হিসেবে ভক্তদের হৃদয়ে বিরাজমান।
Comments
Post a Comment