স্কুটি
স্কুটি
দেবপ্রসাদ জানা
পাঁচদিনের ছুটি কাটিয়ে শ্বশুরবাড়ি ফিরতেই দেখি, বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন স্বামী।
চোখে মুখে অদ্ভুত হাসি।
ভেতরে ঢুকতেই চমকে গেলাম—
ছোট্ট গ্যারাজে ঝকঝকে নতুন এক গাড়ি।
চোখের চাহনিতেই প্রশ্ন করতেই স্বামী গাড়ির চাবি আমার হাতে দিয়ে বললেন—
"আগামীকাল থেকে কলেজে যাবে এই গাড়িতে, প্রফেসর ম্যাডাম!"
আমি হতবাক!
আনন্দে কথা আটকে গেল,
শুধু বিস্মিত হয়ে বললাম— "ওহ মাই গড!"
অতি উচ্ছ্বাসে স্বামীকে জড়িয়ে ধরলাম।
সত্যিই ওঁর উপহার দেওয়ার ধরন সবসময়ই হঠাৎ,
বিনা আড়ম্বরে।
নিজের জন্য এখনো পুরোনো ইন্ডিগো রেখেছেন,
অথচ আমার জন্য নতুন গাড়ি কিনে এনেছেন।
বিয়ের ছ’ বছরে অসংখ্য উপহার দিয়েছেন,
গুনে শেষ করা যায় না।
কিন্তু গাড়ির দিকে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ খেয়াল হল, যেখানে আমার প্রিয় স্কুটি দাঁড়িয়ে থাকার কথা,
সেই জায়গাটা ফাঁকা।
আমি চমকে উঠে বললাম—
"আমার স্কুটি কোথায়?"
স্বামী নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিলেন—
"ওটা বিক্রি করে দিয়েছি।
এখন ওটার আর কী দরকার?
গাড়ি আছে তো।"
কথাটা শুনেই বুকটা কেঁপে উঠল।
আমি চিৎকার করে বললাম—
"আমার সাথে একবার কথা বললে না?
ওই স্কুটি শুধু একটা গাড়ি ছিল না… ওটা আমার প্রাণ। বাবার দেওয়া একমাত্র স্মৃতি।
তোমার উপহার আমি যতই সম্মান করি না কেন,
বাবার স্মৃতি কেড়ে নিয়ে নয়।
আমার, তোমার গাড়ি প্রয়োজন নেই!"
চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
শব্দ শুনে শাশুড়ি বাইরে এলেন।
মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন—
"আমি ওকে বলেছিলাম রে মা,
বউমার সাথে একবার কথা বল।
কিন্তু বাবু এখন বড় হয়েছে,
মায়ের কথা আর শোনে না।
কেঁদে লাভ নেই, মা।
ও গিয়ে ফিরিয়ে আনবে গাড়িটা।"
স্বামী নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আমার কান্না তাঁকে অসহায় করে তুলল।
মাথা নিচু করে কাছে এসে বললেন—
"ভুল করেছি।
বুঝতে পারিনি ওটা তোমার এতটা প্রিয়।
আমি তো ভেবেছিলাম পুরোনো একটা জিনিস।
পড়ে পড়ে নষ্ট হবে তাইইইই -
মাত্র সাত হাজার টাকায়-
ভাঙাচোরা ওয়ালার কাছে দিয়ে দিয়েছি।
ভেবেছিলাম তোমার আনন্দ হবে,
এখনই নিয়ে আসছি।"
আমি ঘরে গিয়ে বসে পড়লাম।
মনটা ভীষণ ভেঙে গিয়েছিল।
মনে পড়ছিল-
ওই স্কুটি আমার কাছে এতটা মূল্যবান।
কলেজে পড়ার সময় এক বান্ধবী নতুন স্কুটি এনেছিল। আমি দাম জিজ্ঞেস করতেই সে বিদ্রূপ করে বলেছিল—
"তোর আর তোর বাবার সাধ্যের বাইরে এই দাম।"
সে মুহূর্তে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো।
বাড়ি ফিরে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—
বাবা "আমরা কি গরিব?"
বাবা মাথায় হাত রেখে স্নেহভরা কণ্ঠে বলেছিলেন—
"না রে, আমরা গরিব নই।
শুধু সময়টা একটু কষ্টে চলছে।"
কয়েকদিন পর,
বাবা একটা নতুন স্কুটি নিয়ে এলেন।
সাদা রঙের,
একেবারে স্বপ্নের মতো।
আমি রাজকন্যা হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন।
বেশ কয়েকদিন সকলের সামনে দিয়ে আনন্দে,
হর্ন বাজিয়ে সকলকে জানান দিয়ে ঘুরলাম।
টিউশনের টাকা দিয়ে তেল ভরলাম।
একদিন বাড়িতে এসে শুনি বাবা মায়ের চাপা ঝগড়া।
কি দরকার ছিল স্কুটিটা এখন?
ওই একটাই তো বাবার দেওয়া স্মৃতি,
তোমাকে বিয়েতে বাবা দিয়েছিলেন,
মেয়ের জিদ পূরণ করতে ওটাও বেচে দিলে?
Comments
Post a Comment