সাধ শতবর্ষে বন্দেমাতরম সংগীতের পরিপ্রেক্ষিত

সাধ শতবর্ষে বন্দেমাতরম সংগীতের পরিপ্রেক্ষিত
জ্যোতির্ময় দাশ

দেড়শ বছর আগেই ইংরেজ শাসিত পরাধীন ভারতে একটি গান রচিত হয়েছিল ভিন্ন এক পরিপেক্ষিতে সেই গান রচিত হওয়ার সঠিক তিনজ্ঞাত প্রকাশিত হয় প্রথম বঙ্গদর্শন সাহিত্য পত্রিকা ৭ই নভেম্বর ১৮৭৫ সালে ১৯৫০ সালে ভারতীয় লোকসভায় জাতীয় সংগীত হিসাবে গৃহীত হয়, গানটি রচয়িতা ছিলেন সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় গানটি তিনি পরবর্তীকালে আনন্দমঠ প্রকাশ, ১৮৮২ উপন্যাসে সন্ন্যাসী আন্দোলনের উদ্দীপক সংগীত বা শ্লোগান হয়ে উঠুক। বন্দেমাতরম গানটির মূল রূপ। 
বন্দেমাতরম 
''''''
এই গানের সম্পূর্ণ উদ্ধৃতির কারণ জানাই এবার যে অতি সম্প্রতি ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ভারতীয় লোকসভার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জাতীয় সংগীতের ন্যাশনাল ম্যান আগে বন্দেমাতরম গানটি পুরোটি উঠাইতে সরকারি কোন অনুষ্ঠানে অথবা রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপালের উপস্থিতির সময় এবং সে সময় সকল শ্রোতা দর্শকদের উঠে দাঁড়িয়ে এই জাতীয় গান কে মর্যাদা প্রদান করতে হবে। অথবা এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে কোন চলচ্চিত্রের কাহিনীর মধ্যবর্তী অংশের এই গানের উল্লেখ বা গীত হলে দর্শকদের উঠে দাঁড়ানোর দায় থাকবে না। 
এবার এই সংগীতের দেড়শ বছরের ইতিকথায় আসা যাক। ১৮৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর অক্ষয় নববীর পূর্ণ লগ্নে বাঙালির যখন জগতের ধাত্রী যাত জগদ্ধাত্রী দেবীর শ্রদ্ধা অর্চনা করে সেই পবিত্র লগ্নে উত্তর ২৪ পরগনা নৈহাটি শহরের কাঁঠালপাড়া গ্রামের শান্ত পরিবেশে এক আম গাছের তলায় ছায়াঘন পূর্বাণী বসে ছয় স্তবকে এক গান রচনা করেন যেটি পরবর্তী সময়ে ভারতের অন্তর আত্মা মথিত আর্তনাদ বন্দেমাতরম হিসেবে নন্দিত হয়। দুর্গাপূজার পরম্পরাগত রীতিকে উদ্বেলিত এবং উদ্ভিদিত হয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যিনি পেশায় ম্যাজিস্ট্রেট জেলা প্রশাসক বা বিচারক ছিলেন এবং পরবর্তীকালে সাহিত্য সম্রাট অভিধায় বন্দিত হন। তিনি জন্মভূমি দেশমাতা কে দেবী হিসেবে। যিনি নদী নালা বিবিধ মাতৃভূমি ফুল ফল সরষে পরিপূর্ণ করেন আবার শত অস্ত্রে অসাধারণ করে শত্রু ও বিদ্রোহকে দমন করেন মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তিনি এই বাংলা ভাষায় রচিত গান গানের প্রচুর সংস্কৃতি শব্দ ব্যবহার করেন যা এই সংগীতকে ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতিক ধারক ও বাহক হয়ে ওঠে। এই বন্দেমাতরম গান ও আনন্দমঠ উপন্যাস প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই যে বাঙালির চিত্ত হরণকাপ ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল তেমন কথা বলা যাবে না। কালের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পড়া-হীনতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকায় গানটি ও গ্রন্থটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে বইও গানটি প্রতি বাঙালিদের মন্থর প্রতিক্রিয়ায় বঙ্কিমচন্দ্র আসা হতো হয়ে সংবাদপত্রে এক চিঠিতে লিখেছিলেন যে তিনি এই সংগীতের বদলে মন দিয়ে উদরম নামে (পাকস্থলী পূরণের জন্য) নামেই আহারের প্রসঙ্গে কবিতা লিখলে বোধ হয় ভালো করতেন। 
প্রথম জনগণ বন্দনা ১৮৮৬ 
কলকাতা ডিসেম্বর ১৮৮৬ সাল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশন হেম চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় গানের প্রথম দুটি স্তবক প্রার্থনা সংগীত হিসেবে গাইলেন উপস্থিত সকল সদস্য উঠে দাঁড়িয়ে সমবেত ভাবি গলা মেলালেন সেই প্রথম কোন রাজনৈতিক আসরে গানটি গীত হলো। 
বঙ্কিমচন্দ্র এই কবিতায় কোন সুরারোপ করেননি কিন্তু সেই অধিবেশনে পন্ডিত যদুনাথ ভট্টাচার্য সেটিকে মোল্লার রাগে কাওয়ালী তালে পরিবেশন করেছিলেন। 
কি অরবিন্দ গদ্য এবং প্রত্যহাসে বন্দেমাতরম কে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন গানের কাব্যিক সুষমা ও আধ্যাত্মিক রক্ষিত করে এটিকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ মন্ত্রের উদ্যান করেন। 
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১০ বছর বাদে ১৮৯৬ সালে জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে সভাপতি করার সময়ে তার অনির্বচনীয় সুললিত কন্ঠে গানটি গেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বিশেষ কিছু অবশ্য বলেন। তিনি তার বহু পূর্বেই  শান্তিনিকেতনের আম্রপুঞ্জের নিহিত অবসরে পদ্ধতি গান হিসেবে  সুরারোপিত করেন ১৯০৪ ও ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ বাণিজ্য িক বিক্রয় ও বিবর্তনের জন্য বন্দেমাতরম গানের রেকর্ড করেন এবং সেটি প্রভূত জনপ্রিয় হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ভারতীয় লোকসভার  বিধি নির্মাণ অধিবেশনে সূচনা হয়। এই সময় সুচেতা বন্দেমাতরম গানটি গেয়েছিলেন। ঠাকুর ছটি স্তবকে রচিত সম্পূর্ণ গানটি ১৫ ই আগস্ট মধ্যরাতে 14 ই আগস্ট এর রাজতন্ত্র থেকে ভারতের মুক্তি লাভের শুভক্ষণে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে গানটি পরিবেশন করে । পরবর্তীকালে এই গানের সুরটি অল ইন্ডিয়া রেডিওর প্রাত্যহিক অনুষ্ঠানে শুরু হওয়ার আগে সিগনেচার টিউন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এক সংগীত বিষয়ে ইতিহাসবিদদের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে ওয়াস্টার কক নামক এক জার্মান সরকারি নাৎসী  অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পেতে পালিয়ে এসে রেডিওতে কাজ করার সময় এই দংশন যন্ত্রাংশের সুরটি রচনা করেন। 
বিতর্কের ঘনঘটা 
বন্দে মাতরম সংগীত সমগ্র ভারতী ব্রিটিশ রাজতন্ত্র থেকে মুক্তি আন্দোলনের সংগ্রাম সংগীত হিসেবে বিবেচিত ও গৃহীত হলেও বিতর্কের কালো মেঘ দেখা দেয়। উপন্যাসে দেবী দুর্গাকে মাতৃভূমির চিত্রকলায় মুসলমান বিরোধী বর্ণনা অংশ মুসলিম লীগকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তোলে। অন্নেরা পরবর্তী তবকে হিন্দু দেবীর উল্লেখের প্রতিবাদ করে। 
১৯৩৭ সালের কেবলমাত্র প্রথম দুটি স্তবক যেখানে এই সব কিছুর উল্লেখ নেই জাতীয় কংগ্রেস অধিবেশনে ব্যবহৃত করা হয়। 
স্বাধীনতা উত্তর কালে বন্দেমাতরম এর জাতীয় গান হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে বিতর্কে সূচনা হয় ১৯৫০ সালে ২৪ শে জানুয়ারি ভারতের প্রেসিডেন্ট রাজেন্দ্র প্রসাদ ঘোষণা করলেন বন্দেমাতরম গান যেটি ভারতের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে সেই গানটিকে জনগণ মনো সঙ্গে সমমর্যাদা প্রদান করা হবে। 
অমর হলেও আহত 
বর্তমানে দেড়শ বছর পরেও বন্দেমাতরম প্রার্থনা প্রতিবাদের ক্ষেত্রে বিতর্কিত বহু মুসলমান ব্যক্তিত্ব বলেন বন্দেমাতরম মূর্তি উপসংহার দোতক যেটা মুসলিম ধর্মের প্রতিবন্ধক মুসলিম ধর্ম একেশ্বরবাদ বিশ্বাসী এবং তারা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন দেব-দেবীর উপাসনার বিরোধী, তাদের কাছে আল্লাহ কি আকবার আল্লাহ ই সর্বশ্রেষ্ঠ। কিন্তু সুরকার এ আর রহমানের এই গানের নতুন সুর দিয়েছেন এবং অত্যন্ত জ্বালাময়ী কন্ঠে তা পরিবেশন করে এই অভিমতের বিপরীতে পরোক্ষভাবে মতবাদ জানিয়েছেন বলে অনেকে মনে করেন। 
অতি সম্প্রতি রাজস্থান এবং জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যের কিছু বিতর্ক তানাবেদেছে যেহেতু সরকারি প্রশাসন থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে যে স্কুল ও মাদ্রাসা বন্দেমাতরম সংগীত প্রার্থনা হিসেবে শুরুর আগে সকলকে সমবেত করতে গাইতে হবে। এর বিরুদ্ধে কিছু মুসলিম সংগঠন জানিয়েছেন এই ধরনের বিজ্ঞপ্তি ইসলাম ধর্ম বিশ্বাসের বিরোধী ।
মুসলিম সংগঠনের মতবাদ হল দেশের প্রতি ভালোবাসা সেবা ও অনুভূতি থেকে  জাগ্রত হওয়া উচিত। তারা যে সংস্কারেও কোথায় বিশ্বাসী নয় তা জোর করে চাপিয়ে দিলে চলবে না আইনি মতবাদের ক্ষেত্রে মাদ্রাজ হাইকোর্ট ও অন্য আদালত রায় দিয়েছে যে বন্দেমাতরমের প্রচলন চলতে পারে কিন্তু তাকে বাধ্যতামূলকভাবে চাপিয়ে দেওয়া উচিত হবে না কারণ ব্যাপারটি যথেষ্ট-স্পর্শকাতর। এই গানের চারপাশে এক রাজনৈতিক বাতাবরণে ও ঘেরাটোপ আছে রাজনীতির পার্টি এই বিজেপি এও কংগ্রেস নিজেদের মধ্যে একে অপরকে দোষারোপ করছে। এই গানকে দেশপ্রেমের প্রতিভু বা রাজনৈতিক ভাবে  কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টা চলছে। 
স্থায়ী উত্তরাধিকার 
প্রতিবছর ৭ ই নভেম্বর অক্ষয় নবমীতে কাঁঠালপাড়ায় একদল কীর্তনীয়া এক খেলার মাঠে সমবেত হয়ে মূল গানটি পুরোটা গান করেন। তাদের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয় শত শত ভাবছি এবং সুরের নয় তালে সিনেমা জনপ্রিয় হয় সংগীত অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক মঞ্চে স্বাধীনতার গান হিসেবে সারা ভারতবাসী বন্দেমাতরম গান করা হয়  উদ্বেলিত ভাব এবং জন্মভূমির প্রতি নিবেদিত  বন্দনা গীতি হিসাবে। প্রাচুর্যের আনন্দ অনুভব দুর্ভিক্ষে এবং অগ্নিতে ক্ষতির লগ্নে এই জগতের মন্ত্র হয়ে ওঠে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্পন্দন তুলে। 
দেব-দেবী দুর্ভিক্ষ সন্ন্যাসী বৃন্দ মধ্যরাতে বেতার ঘোষণায় রক্তে রাঙা রাজপথের কথায় সবকিছু এই গানের স্তবকে স্তবকে ধরা আছে যা মৃত্যুতে অগ্রাহ্য করে প্রাণের তরঙ্গের স্পন্দিত হতে থাকে দেড়শ বছর আগের রচিত হয় এই স্বাধীনতা সংগ্রামের অমর সংগীত।



 

Comments

Popular posts from this blog

কলকাতার নামকরণ

অশ্বত্থামা

রবীন্দ্রনাথের প্রতি সুকান্ত